রাজনীতির নতুন সমীকরণ
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৩, ২১:২৫
চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একটিতেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারলো না। একটি বৃহত্ দলের এরকম বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের ব্যাপারটি জাতীয় নির্বাচনের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধরনের একটি ধাক্কা। দলটির এখন মাঠ পর্যায় থেকে শুরু তরন নীতি নির্ধারণী মহল পর্যন্ত বিশ্লেষণমূলক আত্মোপলব্ধি ভীষণ জরুরি। আর কয়েকদিন পর অনুষ্ঠিত হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সেখানে আওয়ামী লীগ জিততে পারবে? জাহাঙ্গীর নাটক দেখে তা মনে হয় না।
কথা হল, জনপ্রিয়তার প্রশ্নে নেতিবাচক অথবা ইতিবাচক একটা প্রভাব তো বড় দল দুটির ভেতর থাকবেই। প্রতিটি নির্বাচনের সময়, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাই হয়। জনগণ সংক্ষুব্ধ হলে কখনো আওয়ামী লীগের কখনবা বিএনপির দিকে পাল্লা হেলে পড়ে। বিশিষ্টজনগণের মধ্যে আবার কেউ কেউ বলেছেন, সরকারের সাড়ে চার বছরের অপশাসন এবং ক্ষমতার দর্পের জওয়াব জনগণ ভোটের মাধ্যমে দিয়েছেন। বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে বিরোধী দলের প্রতি সরকারের দমননীতি চলতে থাকলে জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে।
চার সিটিতে বিজয়ের আনন্দ ধারণ করে বিএনপি বেশ জোরেসোরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। কিন্তু সংসদে মুলতবি প্রস্তাব জমা দিয়ে আবার তা প্রত্যাহার করে নেয়া হলো কেন? আলোচনা-দোষারোপ-ওয়াক আউট ইত্যাদির মধ্যে থেকেও নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা হয়তবা বেরিয়ে আসতে পারতো। বিভেদ আর বিতর্ক যখন এগুচ্ছেই, অসহিষ্ণুতা যখন দিনকে দিন চরমে, তখন বিএনপি সংসদে শেষ সময়ে এসে যোগ দিল কেন, এতদিন যোগ দিলই-বা না কেন? যে ইস্যুগুলোতে সংসদ বর্জন ছিল এখন কি তার পরিবর্তন ঘটেছে? নাকি সংসদ এখন মন্দের ভাল, বা সদস্যপদ টিকিয়ে রাখার ব্যাপার আছে।
দুইটি বড় দলের প্রধান দুই ব্যক্তির ইচ্ছের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই, এটিই এখন গণতান্ত্রিক বাতাবরণে সবচেয়ে বড় পলিটিকেল লজিক। আন্তর্জাতিক মুক্তি আন্দোলনে নৈরাজ্যবাদ বিরোধী মিখাইল বাকুনিনের মতে, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পারে খুবই স্বেচ্ছাচারী। এমনকি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। যখন তা ‘সাধারণ ইচ্ছার’ আড়াল নিয়ে নিজের যৌথ প্রতাপের সকল শক্তি দিয়ে নিজের প্রত্যেকটি সদস্যের ইচ্ছা ও স্বাধীন মত দমন করতে শুরু করে। এখানে ‘সর্বজনীন ভোটাধিকার’-এ প্রতিষ্ঠিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অনৈতিক কাঠামো থেকেই উঠে আসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ফলে রাষ্ট্রের অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতায় আর যাই হোক, ব্যালটের গোপন সিদ্ধান্তটা নিতে জনগণ কখনো ভুল করে না।
নির্বাচনের পরের দিন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, গণতান্ত্রিক সরকারের দ্বারাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব। এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। এমনকি তিনি আশংকা করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলে নির্বাচনই হয়ত হবে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
সামগ্রিক অবস্থা থেকে এটি সুস্পষ্ট প্রতীয়মান যে, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নির্বাচনকেন্দ্রিক অমীমাংসিত ইস্যুটি ঘুরে-ফিরে সমান্তরাল অবস্থানে চলছে, যা জনগণকে বিভ্রান্ত কিংবা অন্য অর্থে করে তুলছে উদ্দেশ্যহীন। সংকট থেকে সংকটের এই যে উত্তরণ, দুর্দশাগ্রস্ত জাতির অনিশ্চয়তার দায় দু’টি প্রধান দলকেই নিতে হবে। কারণ ঘুরে-ফিরে তারাই ক্ষমতায় আসছেন। ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক মোহ আর ইচ্ছেমাফিক শাসনের ভেতর থেকেই এইসব সংকটের জন্ম।
নির্বাচনী ফলাফলের ভেতর দিয়ে জাতীয় রাজনীতির অন্তর্গত রূপ অনেকটাই প্রকাশ পেয়ে গেছে। ভোটের হিসাবে চলছে নতুন নতুন সমীকরণ। বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক ছাড়াও জামায়াত এবং হেফাজতের ভোট একত্র করলে আওয়ামী লীগ ছাড়া ১৪ দলের মোট ভোট তাদের এক-চতুর্থাংশ হবে কিনা সন্দেহ। এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভোটের জন্য যে জনসম্পৃক্ততা দরকার, বাম দলগুলো নিরলস চেষ্টা করেও তা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির ভোটের হিসাব অন্যরকম। এরশাদ সাহেব সরকারের প্রতি যত না সন্তুষ্ট, তারচে সমালোচনাই বেশি করেছেন। যা ভোটের হিসেবেও সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলা স্বাভাবিক।
আল্লামা শফী সাহেব ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর অবশ্য বলেছিলেন, সরকার নির্বাচনে এর উপযুক্ত জবাব পাবে। আবার দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনের মতে, জঙ্গি গোষ্ঠীর অপপ্রচারে হেরে গেল আওয়ামী লীগ। যে কোন অপপ্রচারের ভিত্তি হচ্ছে অপশক্তি। অপশক্তির অপপ্রচারটাই যদি হয় যুক্তি, তাহাকে কী ধরে নিতে হবে, নির্বাচনে অপশক্তির অপপ্রচার বড় ধরনের একটি ফ্যাক্টর? এর পাল্টা প্রচার-প্রসারে আওয়ামী নেতা ও কর্মীরা নিঃসন্দেহে তবে ব্যর্থ। আবার পরাজয় নিয়ে শোনা যাচ্ছে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা। বরিশালে হেরে যাওয়া মেয়র শওকত হোসেন হিরন সরাসরি দায়ী করেছেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে।
এসব যুক্তিতর্কের আপেক্ষিক বিচারে বরং বলা যেতে পারে, চার সিটি নির্বাচনের ফলাফলে, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জনমনে ভোটের প্রভাব এখন কতটুকু? জনগণের ভেতর প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার আড়ালে জেগে উঠেছে নীরব আত্মোপলব্ধি। কি আওয়ামী লীগ, কী বিএনপি- নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিবর্তনের ভেতর মানুষের অন্তর্গত দাবি হল, সুশাসন। সেই অর্থে, চার সিটি নির্বাচনের ফলাফলটা অনেকটা প্রতীকী প্রতিবাদ।
এদিকে গত ১৬ জুন নিউইয়র্ক-এ ‘ইউএস কমিটি ফর সেক্যুলার ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশ’- এর সমাবেশে বক্তারা সরকারকে সতর্কমূলক হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেন, সামনের নির্বাচনেও বিএনপি-জামায়াত জিতবে। জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধ না হলে জাতীয় নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তিকে হয়ত করুণ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। অতএব, মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে এখনই সতর্ক হতে হবে।
লেখক : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক