ডিগ্রী পর্যায়ে ছাত্রী উপবৃত্তির প্রচলন
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৩, ২১:৪৬
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল প্রথমবারের মত স্নাতক বা ডিগ্রী পর্যায়ে ছাত্রী উপবৃত্তি প্রদান কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করিয়াছেন। এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের এক লক্ষ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রী এই সুবিধা লাভ করিবেন। সুবিধা হিসাবে একজন ছাত্রীকে উপবৃত্তি ২ হাজার ৪০০ টাকা, পরীক্ষার ফি বাবদ ১ হাজার টাকা, বই কেনার জন্য ১ হাজার পাঁচশত টাকা ও টিউশন ফি বাবদ ৭২০ টাকা মিলাইয়া সর্বমোট ৫ হাজার ৬২০ টাকা প্রদান করা হইবে। এই জন্য প্রতি বত্সর ব্যয় ধরা হইয়াছে ৭৫ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা।
উল্লেখ্য, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক স্তরে সর্বপ্রথম উপবৃত্তি কার্যক্রম শুরু হয়। ইহার উদ্দেশ্য ছিল নারীর ক্ষমতায়ন, সকল দরিদ্র মেয়েকে শিক্ষার আওতায় আনয়ন ও ড্রপআউটের হার ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামাইয়া আনা। একই লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়া ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষ হইতে উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্রী উপবৃত্তি চালু করা হয়। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি সত্ত্বেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী উপবৃত্তি প্রচলন একেবারে বৃথা যায় নাই। এই দুই শিক্ষাস্তরে এখন ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত প্রায় সমান। অর্থাত্ শিক্ষা-দীক্ষায় নারীদের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরাম ও সংস্থার মাধ্যমে তাহার স্বীকৃতিও মিলিতেছে। এখন ডিগ্রী পর্যায়ে ছাত্রী উপবৃত্তি চালু করায় উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে আরও বাড়িবে। নব্বই দশকে যখন ছাত্রী উপবৃত্তি চালু হয়, তখন বিদেশি অনুদানই প্রধান ভরসা ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান করা হইতেছে। এই জন্য গত বত্সর ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে একটি বিল পাস হয়। অর্থাত্ পশ্চিমা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুযায়ী এই ধরনের কর্মসূচিতে আজ আমরা স্বনির্ভরশীল হইয়া উঠিয়াছি।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের অর্থের উত্স হইল—সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত দান ও অনুদান, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদির আর্থিক সহায়তা, লটারি, সমাজের বিত্তবান, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের অনুদান এবং প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তা। এইভাবে সরকারের উপবৃত্তি প্রদান কিংবা বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান সবই প্রশংসনীয় ও মহত্ উদ্যোগ। তবে উপবৃত্তির সুফল যাহাতে পাওয়া যায় সেইদিকে আমাদের খেয়াল রাখিতে হইবে। কয়েক বত্সর আগে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজির একজন ভিজিটিং ফেলোর গবেষণায় দেখা যায় যে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উপবৃত্তি গ্রহণকারী মোট ছাত্রীর ৬০ ভাগই ঝরিয়া পড়িতেছে। বিবাহ-শাদী ও সামাজিক বাস্তবতাই ইহার মূল কারণ। যদিও ডিগ্রী পর্যায়ে ছাত্রী উপবৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি, পিতা-মাতার নিম্ন আয় ও অবিবাহিত থাকার ব্যাপারে শর্তারোপ করা হইয়াছে, তথাপি এইসব নিয়ম-কানুন কতটা বাস্তবায়িত হয় তাহাই দেখিবার বিষয়। অনেকে মনে করেন, উপবৃত্তি, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ইত্যাদি আমাদের তৃণমূলের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও দুর্নীতিগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছে। এই অভিযোগ আমলে না নেওয়ার কোন কারণ নাই। অন্যদিকে একটা পর্যায়ে উপবৃত্তির ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা না করিলে নূতন করিয়া সামাজিক সংকট দেখা দিতে পারে। এই ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক হইতে হইবে বৈকি।