নান্দনিক নিদর্শন গোলপাতার মসজিদ

পুনর্নির্মিত এ মসজিদে রয়েছে ২৩শ’ মুসল্লির একসঙ্গে নামাজের সুবিধা, ১০০ জনের ওযুখানা, সুপেয় ও ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা, একতলা ও দোতলায় শীততাপ নিয়ন্ত্রণসহ আধুনিক ব্যবস্থা। ঝাড়বাতিসহ চোখজুড়ানো আলোক ব্যবস্থা, মুসলিম ক্যালিগ্রাফি খঁচিত দেয়াল, তোরণ, দরজা-জানালা, কাঠের প্যানেলের মিমবার তথা মার্বেল পাথর ও টাইলসে মোড়ানো মসজিদের ফ্লোর ও সিঁড়ি

নাসিম আলী, পিরোজপুর অফিস

 

১৮৮২ সালে তত্কালীন মহকুমা শহর পিরোজপুরে গোলপাতার ছাউনি দিয়ে নির্মিত জামে মসজিদটিকে এখন ইতিহাসের অংশ বলা চলে। দীর্ঘ ১৩৬ বছরে গোলপাতা ছাউনির এই মসজিদটি এখন পিরোজপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে আধুনিক মুসলিম স্থাপত্যকলার নান্দনিক নিদর্শনে রূপ নিয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লির একত্রে নামাজ আদায়ের সুবিধাসম্বলিত পাঁচতলা বিশিষ্ট সুদৃশ্য দালানের এই মসজিদেই চলতি রমজান মাসে শুরু হয়েছে তারাবিহ নামাজ। গত ৩ মে জুম্মার নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে পুনর্নির্মিত এই মসজিদে দীর্ঘ ২ বছর পর আবারো মুসল্লিরা নামাজ, জিকির, ইবাদাত-বন্দেগি শুরু করেছেন। শতবর্ষের পুরোনো তিনতলা মসজিদটি ২ বছর আগে ভেঙে ফেলা হয়েছিল জরাজীর্ণতার কারণে।  

পুনর্নির্মিত এ মসজিদে রয়েছে ২৩শ’ মুসল্লির একসঙ্গে নামাজের সুবিধা, ১০০ জনের ওযুখানা, সুপেয় ও ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা, একতলা ও দোতলায় শীততাপ নিয়ন্ত্রণসহ আধুনিক ব্যবস্থা। ঝাড়বাতিসহ চোখজুড়ানো আলোক ব্যবস্থা, মুসলিম ক্যালিগ্রাফি খঁচিত দেয়াল, তোরণ, দরজা-জানালা, কাঠের প্যানেলের মিমবার তথা মার্বেল পাথর ও টাইলসে মোড়ানো মসজিদের ফ্লোর ও সিঁড়ি। শহরের কেন্দ্রস্থলের মসজিদে রয়েছে সুউচ্চ একটি সুশোভিত কারুকাজময় গম্বুজ, যা দৃশ্যমান হয় বহুদূর থেকে। মসজিদটি নির্মাণশৈলীতে রয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির ব্যতিক্রমী এক নিদর্শনে প্রতিভাত।

ভারতের উত্তর প্রদেশের জৈনপুর থেকে ইসলাম প্রচারে পিরোজপুর এসে বসতি স্থাপনকারী হাফেজ মোহাম্মদ সোলায়মান শতবর্ষের প্রাচীন এ মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৮২ সালে তিনি দামোদর নদীর দক্ষিণ ও বলেশ্বর নদের পূর্ব তীরে বসতি স্থাপন করেন। ১৮৫৯ সালে পিরোজপুর মহকুমা ঘোষিত হওয়ার পর ১৮৬৭ সালে প্রশাসনিক কাজ শুরুর জন্য তত্কালীন রায়েরকাঠির জমিদার দেবেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর ইংরেজ স্ত্রী হেন্ড্রিয়েটা লুকাসের কাচারি ভবনটি বেছে নেওয়া হয়। মহকুমা প্রশাসনের দাপ্তরিক কাজ একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে শুরু হয়। ১০০ বছর পর এই ভবনটি ১৯৬৭-৬৮ সালে মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় নির্মাণের সময় ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে পিরোজপুর জেলায় উন্নীত হলে কালেক্টরেট ভবন হিসেবে এই মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়টি ব্যবহূত হয়েছে। হাফেজ মোহাম্মদ সোলায়মানের বসতবাড়ি ও মসজিদের মাঝ দিয়ে যে রাস্তাটি তৈরি করা হয় তা এখন শহরের প্রধান সড়ক। শহরের খাবার পানির রিজার্ভ পুকুর, গোপাল কৃষ্ণ টাউন হল ও ক্লাব একে একে এ মসজিদের কাছাকাছি খনন ও নির্মাণ করা হয়। মসজিদের উত্তর ও পূর্বদিকে গড়ে ওঠে বাজার। এমনকি মসজিদের লাগোয়া উত্তর-পূর্ব কোণে নির্মাণ করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় মদন মোহন জিউ মন্দির (আখড়া বাড়ি)। এভাবেই হাফেজ মোহাম্মদ সোলায়মান প্রতিষ্ঠিত মসজিদটি পিরোজপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং কালক্রমে নাম হয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সময়ের প্রয়োজনে ধর্ম প্রচারক এ বুজর্গ পুরুষ ১৮৯৪ সালে পিরোজপুর কেন্দ্রীয় মসজিদটিকে একতলা দালানে রূপ দিতে  শুরু করেন। যা তাঁর পরবর্তী ওয়ারিশ ও শহরের মুসল্লিগণের আরো দুই দফা প্রচেষ্টায় তিনতলায় পরিণত হয়। ষাটের দশকে নির্মিত হয় তৃতীয় তলা। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বড় মসজিদ নামে খ্যাত এ ইবাদাত খানায় শহরের মুসল্লিগণের জুম্মা ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, ওয়াজ-তাফসির মাহফিল, বিয়ে-শাদির আকদ অনুষ্ঠানসহ ইবাদত-বন্দেগির পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহূত হয়।

২০১৭ সালে শতবর্ষের বেশি প্রাচীন এ জামে মসজিদটি ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করা হলে পুনর্নির্মাণের জন্য দাতার সন্ধান শুরু করা হয়। তখন কমিটির সভাপতি ও পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম শেখ মসজিদ কমিটির সহযোগিতায় জেলার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একটি তালিকা সংগ্রহ করেন। উদ্যোক্তারা তখন ভেবেছিলেন মসজিদ পুনর্নির্মাণে কয়েক কোটি দরকার এবং দাতাও লাগবে অনেক। বেশকিছু দাতা পাওয়ার পর  ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর মসজিদটির পুনর্নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাচীন এই মসজিদটিকে মাত্র দেড় বছরের প্রচেষ্টায় রূপ দেওয়া হয় অনন্য একটি মুসলিম স্থাপনায়। মুসলিম স্থাপত্যকলার আধুুনিক নিদর্শন পাঁচতলা বিশিষ্ট এ জামে মসজিদ এখন এই অঞ্চলের ব্যতিক্রমী একটি স্থাপনা।

চলতি রমজানে তারাবি নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে গত ৩ মে জুম্মার নামাজের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয় এই ঐতিহাসিক মসজিদটি। উদ্বোধনের মাধ্যমেই যেন ধারাবাহিকতা রক্ষা হলো ইসলাম প্রচারের ব্রত নিয়ে তথা এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের মুসলিম ধর্মে দীক্ষা দিতে ১৮৮২ সালে আসা হাফেজ মোহাম্মদ সোলায়মানের সূচিত ও পরিচালিত একটি মহান কাজের। গোলপাতার ছাউনি দিয়ে তিনি যে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তা  প্রজন্মের হাতে  রূপান্তরিত হলো ইতিহাসের নতুন স্থাপনায়। এই মসজিদেই তিনি ৪০ বছর ধরে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মোতওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি জৈনপুর থেকে  তাঁর সন্তানদের পিরোজপুরে নিয়ে আসেন। হাফেজ মোহাম্মদ লোকমান ও হাফেজ মোহাম্মদ নোমান নামের দুই ছেলেকে এখানে ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করেন। ১৯৪৫ সালে মোহাম্মদ সোলায়মান জৈনপুরে ইন্তেকাল করেন। হাফেজ মোহাম্মদ নোমানের ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘শতবর্ষ আগের মসজিদটি যেমন আমার দাদার হাতে প্রতিষ্ঠিত ও নির্মিত, পুুনর্নির্মাতাদের হাতে তা আরো শতাধিক বছরের আয়ু পেল, পেল অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা। দাতাদের এ অনন্য অবদানকে শুধু ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না।’