বছরঘুরে আবারও এলো পবিত্র মাহে রমজান। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালন করা হয় এই রমজান। একজন রোজাদারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ইফতারের সময়। তবে সব দেশে ইফতার সংস্কৃতি এক না। একেক দেশে একেকরকম। ইফতার আয়োজনে উঠে আসে তাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি। কিন্তু কিছু কিছু খাবার আছে যা সব দেশের ইফতারের আয়োজনেই থাকে। এর অন্যতম একটি হলো খেজুর। হজরত মুহাম্মদ (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন বা পানি পান করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও ইফতার শুরু হয় খেজুর বা পানি দিয়ে। কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্বের অনেক দেশেই ইফতার উত্সবে পরিণত হয়েছে। আর যুক্ত হয়েছে বিচিত্র ধরনের খাবার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতারের বৈচিত্র্য নিয়ে আমাদের এ আয়োজন—
বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ইফতার সংস্কৃতি সবারই জানা। বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিজের পরিবার-পরিজনদের নিয়ে ইফতার করাটা অনেকদিনের রীতি। ইফতারের তালিকায় থাকে খেজুর, শরবত, ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি, চপ, জিলাপি, কাবাব, হালিম ইত্যাদি। দেশের ইফতার বাজার হিসেবে পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। রমজানে প্রতিদিন দুপুর থেকেই চকবাজার ছাপিয়ে পুরান ঢাকার অলিগলির বাতাসে ভাসে নানা স্বাদের মুখরোচক খাবারের মনকাড়া সুবাস। এখানকার ইফতার সামগ্রীর প্রতি সবসময়ই বিশেষ আগ্রহ থাকে রোজাদারদের।
কালক্রমে এর কদর যেন বেড়েই চলছে। এখানকার ঐতিহ্যের আদি স্থাপনাগুলো এখন আর নেই। কিন্তু রয়ে গেছে ইফতারের ঐতিহ্য। সেই চির পরিচিত হাঁকডাক। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি দোকান। ভোজনরসিক মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের ভেতর থেকে বিক্রেতার কণ্ঠে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়।’ চকবাজারের ইফতারের আইটেমের মধ্যে আরও রয়েছে সুতি কাবাব, শাহী জিলাপি, খাসির হালিম, খাসির লেগ রোস্ট, গরুর রোস্ট, কোয়েলের রোস্ট, খাসির কাবাব, টিক্কা কাবাব, চিকেন কারি, সাফলিং, চিকেন চাপ ও রোল, মুরগির রোস্ট, দই বড়া ইত্যাদি।
সৌদি আরব
সৌদি আরবের চেয়ে ইফতারের বড় আয়োজন আর কোনো দেশেই করা হয় না। মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববিতে বিশ্বের সর্ববৃহত্ এ আয়োজন করা হয়। পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে প্রতিদিন ইফতার করেন ১০ লক্ষাধিক রোজাদার। পবিত্র জমজম কূপের পানির সঙ্গে সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী খেজুর-খোরমাসহ নানা পদের খাবার দিয়ে এখানে ইফতার করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। তবে এখন পর্যন্ত এত বিপুলসংখ্যক মুসল্লির ইফতার সামাল দিতে কোনো বিশৃঙ্খলা হয় না। ধনী-গরিব সবাই একাকার হয়ে পবিত্র কাবা চত্ত্বরের ইফতার করতে সামিল হন। ইফতার ও নামাজের পর পথে পথে মুসল্লিদের গরম চা ও কফি পরিবেশন করে তরুণরা। মুসল্লিদের হাতে গরম চা ও কফির পেয়ালা তুলে দিয়ে এক চরম প্রশান্তি অনুভব করে তারা।
সৌদি আরবের প্রায় সব জায়গার ইফতার আয়োজনেই থাকে নানা ধরনের মুখরোচক খাবার। কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুচান্ডর নামক নানারকম হালুয়া এ খাবার দাবারের অংশবিশেষ। এছাড়া রয়েছে সাম্বুচা নামক একধরনের খাবার। যা দেখতে ঠিক সমুসার মতো, এটি মাংসের কিমা দ্বারা তৈরি। এটির আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে কোনো মরিচ থাকে না। থাকে সালাতা নামের একপ্রকার সালাদ। এছাড়াও থাকে সরবা, জাবাদি দই, লাবান, খবুজ (ভারি ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি)। খেজুরের নানারকম লোভনীয় আইটেম তো রয়েছেই। খেজুরের বিস্কুট, পিঠা ইত্যাদিও থাকে তাদের এ আয়োজনে।
মিসর
রমজান মাসে মিসরের পথে পথে লেটুস পাতা বিক্রি করতে দেখা যায়। সেখানকার ইফতারে এ পাতার দারুণ সমাদর। ইফতারের মেন্যুতে কোনাফা ও কাতায়েফ থাকতেই হবে। এগুলো মূলত কেক জাতীয় খাদ্য। যেগুলো আটা, চিনি, মধু ও বাদাম দিয়ে তৈরি হয়। তবে মিসরে ইফতারের প্রধান মেন্যুতে থাকে শরবত, দুধ, নানারকমের ফল, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কেক, পিঠা প্রভৃতি। আর নিয়মিত অনুষঙ্গ খেজুর তো আছেই। ইফতারের জন্য বাদাম, কিসমিসসহ প্রভৃতি উপকরণে তৈরি করা হয় তায়েফ পিঠা। এছাড়া বাজারের শহর খ্যাত রাজধানী কায়রোর অলিগলিতে পসরা সাজিয়ে বসে হরেকরকম ইফতারির দোকান। বাংলাদেশের মতো মিশরের মুসলমানরাও একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করেন। অনেকে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে একসঙ্গে বাসায় ইফতার করেন।
তুরস্ক
এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের সেতুবন্ধন হিসেবে তুরস্ককে আমরা সবাই চিনি। এদেশটির অধিকাংশ মানুষই ধর্মপরায়ণ। এদেশেও খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করেন রোজাদাররা। তুরস্কের অনেক জায়গায় ‘রমজান কিবাবি’ নামক খাদ্যটির ইফতার হিসেবে আলাদা কদর রয়েছে। এটা বিশেষ ধরনের কাবাব। নানারকম শরবতের ব্যবহারও বেশ পুরোনো। এছাড়া জলপাই, বিখ্যাত রমজান পাইড রুটি, পনির, মশলাদার গরুর মাংসের পাতলা স্লাইস, সসেজ, মিষ্টি মাখন, ফল, মধু, প্রচুর পরিমাণ টমেটো, শশা ইত্যাদি দিয়ে ইফতার করেন তুর্কিরা। তুর্কিদের ইফতার আয়োজনে শুধু মুসলমানরাই নয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও এক কাতারে বসে ইফতার করে। এছাড়া বড় বড় মসজিদের চারপাশে শত শত দোকানদার নানারকম ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসে।
অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে তুর্কিরা আরও আগে থেকেই পরিচিত। যার প্রমাণ বিশ্বের সর্বাধিক শরণার্থীর বাস তুরস্কে। এদের একটা বড় অংশ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পীড়িত মানুষ। রমজানে সাধ্যমতো শরণার্থীদের ইফতারের ব্যবস্থা করেন অনেক তুর্কি। বর্তমানে এটিও তাদের ইফতার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭০ লাখ মুসলমান বসবাস করেন। এখানকার রোজাদাররা খেজুর, খুরমা, সালাদ, পনির, রুটি, ডিম, মাংস, ইয়োগার্ট, হট বিনস, আঙুর, তরমুজ, আপেল, কমলা, কেন্টালপ, চিকেন পাকুরা, স্যুপ, চা ইত্যাদি দিয়ে ইফতার করেন। রমজানে হোয়াইট হাউসেও মুসলমানদের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রমজানে হোয়াইট হাউসে ইফতার পার্টি প্রথম শুরু করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল কিনটন। এটা বর্তমানে একটি প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।