বাজেট ও নিম্ন আয়ের মানুষ
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৩, ২২:১৪
বাংলাদেশের ২০১৩-১৪ অর্থ বত্সরের বাজেট লইয়া চলিতেছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেহ কেহ এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলিয়াছেন। অর্থমন্ত্রী নিজেও বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলিয়াছেন। তবে এই বাজেট উচ্চাভিলাষী কিনা তাহা নির্ভর করিতেছে বাজেটের ব্যয় ও অর্থায়নের পরিকল্পনার উপর। একটি বাজেটের ব্যয় বা বরাদ্দের সাথে অর্থায়নের যে সম্পর্ক বা অর্থায়নের দিক থেকে যে চাপ বা সীমাবদ্ধতা তাহার প্রেক্ষাপটে সেই বাজেট উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিনা তাহা বিবেচনা করা হয়। যদি বরাদ্দের দৃষ্টিকোণ হইতে গত বত্সরের বাজেটের সাথে এই বত্সরের বাজেটকে তুলনা করা হয়, সেক্ষেত্রে এই বাজেট বেশি উচ্চাভিলাষী নয়। কিন্তু যদি আমরা অর্থনীতির দিক হইতে দেখি, তাহা হইলে এ বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। কারণ অর্থনীতিতে নানাবিধ চাপ রহিয়াছে। অর্থনীতির বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাইতেছে, আমদানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। ইহাছাড়াও মূল্যস্ফীতির যে চাপ—এসব মিলিয়ে চাপের মুখে রহিয়াছে অর্থনীতি। আর আমরা দেখিতে পাইতেছি বর্তমান অর্থ বত্সরের কর আদায়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে নাই এনবিআর। সেদিক থেকে চিন্তা করিলে অর্থনীতিতে চাপ থাকার কারণে কর আদায়ের যে লক্ষ্য ধরা হইয়াছে, তাহা অর্জন করা খুব কঠিন হইবে। প্রশ্ন হইল—বত্সর বত্সর আমরা যে ঘাটতি বাজেটে যাইতেছি এবং আভ্যন্তরীণ খাত মূলত ব্যাংকিং খাত হইতে ঋণ করার মাধ্যমে ঘাটতি বাজেটের যে অর্থায়ন করিতেছি, তাহার যে নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপর তাহা কি আমরা খতাইয়া দেখিয়াছি।
আমরা যদি বাজেটের চলতি ব্যয়ের দিকে তাকাই তাহা হইলে দেখিব আভ্যন্তরীণ ঋণের উপর সুদ পরিশোধ করা হইয়াছে ছাব্বিশ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের উপর সুদ প্রদান করা হইয়াছে এক হাজার সাতশো চল্লিশ কোটি টাকা। অথচ আভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় সমান। বর্তমানে আমাদের জিডিপির ৪০ শতাংশের মত ঋণ রহিয়াছে ; ইহার মধ্যে ২০ শতাংশ আভ্যন্তরীণ আর ২০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ। একই পরিমাণ ঋণ থাকিলেও আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ১৪ হইতে ১৫ গুণ বেশি সুদ প্রদান করিতে হইতেছে। সরকার যেহেতু আভ্যন্তরীণ খাত হইতে তাহার ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন করিতেছে, তাই সরকারের একটা চেষ্টা থাকে, কীভাবে আভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ কমানো যায়। সে ঋণের সুদ কমানোর জন্য আমরা দেখি সরকার ব্যাংকের ডিপোজিটের হার কমাইয়া রাখার চেষ্টা করে, সঞ্চয়পত্রের উপর সুদের হার কমাইয়া রাখার চেষ্টা করে, সঞ্চয়পত্রের আয়ের উপর কর প্রয়োগ করে। এসব নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রভাবিত করে এবং আয়ের বৈষম্যের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এদেশের ষোল কোটি মানুষের যে ক্ষুদ্র সঞ্চয় তা কিন্তু তাহারা ব্যাংকে রাখে। সেই ব্যাংকের সুদের হার যখন কমাইয়া রাখা হয়, যাহারা সঞ্চয়পত্র কেনেন, তাহাদের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যখন কমানো হয়, সঞ্চয়পত্রের আয়ের উপর যখন কর প্রয়োগ করা হয়—অর্থাত্ সরকারের খরচ কমানোর যে প্রক্রিয়া, তাহার পুরো চাপটা আসে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের উপর। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যার কারণে যে খেলাপী ঋণ হইতেছে, বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার কারণে ব্যাংকিং খাত হইতে যে পরিমাণ টাকা বাহির হইয়া যাইতেছে তাহার ভারও নিতে হইতেছে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের। তাহা হইলে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থা ও ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন—এই দুই কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইতেছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। সুতরাং পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের নিম্ন আয়ের মানুষেরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তাহা মাথায় রাখিয়া সামনে এগুনো উচিত।