উত্সবে উচ্ছ্বাসে বর্ষপূর্তি পালন

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’—এ শ্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে দেশের উচ্চ শিক্ষার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার ৯৩ বছরে পদার্পণ করল দেশের ইতিহাস, গৌরব ও ঐতিহ্যের ধারক এ বিশ্ববিদ্যালয়। নবীন-প্রবীণ শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। দিবসটিতে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, কেক কাটা, গবেষণা ও আবিষ্কার বিষয়ক প্রদর্শনী, বিতর্ক, কুইজ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, প্রীতি ফুটবল ম্যাচ, প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিসহ নানা আয়োজনে মেতে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। উত্সবের উদ্যানে পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও হলে আলোকসজ্জা করা হয়। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের করিডোর বেলুন, ফেস্টুন আর আল্পনার ছোঁয়ায় বর্ণিল রূপ পায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে অনুষ্ঠান বর্জন করে বিএনপি এবং জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা। গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে জাতীয় পতাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটার মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন চত্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। উপাচার্য অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রঙ-বেরঙের বেলুন, ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হলসমূহ থেকে শোভাযাত্রাসহ প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন চত্বরে জমায়েত হন। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন এবং নৈতিক শিক্ষা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তিনি বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান। অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশ ও জাতিকে যা দিয়েছে, বিশ্বের আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় তা দিতে পারেনি। এ অনুষ্ঠানের পর ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভ্যাগত অতিথি, ছাত্র-ছাত্রীরা এতে অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে গিয়ে শেষ হয়। সকাল ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে উদ্বোধনী নৃত্যের মাধ্যমে আলোচনা পর্বের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র পরিবেশিত হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অজয় রায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, অধ্যাপক সহিদ আক্তার হোসাইন (প্রশাসন), ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রকীব উদ্দীন আহমেদ প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। দিবসটিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, অনুষদ এবং বিভাগও পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করে। বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের উদ্যোগে ৩ দিনব্যাপী গবেষণা ও আবিষ্কার বিষয়ক প্রদর্শনী, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের উদ্যোগে এবং ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তত্ত্বাবধানে অনুষদ চত্বরে ‘মুক্তমনের আনন্দ’ শীর্ষক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে ডিইউডিএস’র আয়োজনে প্রীতি বিতর্ক, স্ব স্ব বিভাগ ও অনুষদে বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রীতি ফুটবল এবং প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। টিএসসি মিলনায়তনে সংগীত বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাট্যকলা বিভাগের উদ্যোগে যাত্রাপালা, বাঁধনের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে পাণ্ডুলিপি প্রদর্শনী, চারুকলা অনুষদে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন চত্বরে আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অন্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী, ৬০ জন শিক্ষক, তিনটি অনুষদ ও তিনটি হল নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৭ হাজার ৮২৭ জন। শিক্ষক রয়েছেন এক হাজার ৮০৯ জন। ১৩টি অনুষদের আওতায় ৭২টি বিভাগে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ১৯টি হল।