অভিনেত্রী মিতা নূরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

টিভি অভিনেত্রী মিতা নূরের (৪৪) অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করেছে। গলায় ওড়না পেঁচানো লাশটি ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিলো। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে- এটি আত্মহত্যা হতে পারে। তারা লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছে। মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় গতকালই গুলশান থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন মিতা নূরের পিতা ফজলুর রহমান। এতে তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি, মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কি কারণে আত্মহত্যা করেছে সে বিষয়ে কিছুই জানাননি। অবশ্য সাংবাদিকদের তিনি জানান, স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে মিতা নূর আত্মহত্যা করেছে। তবে মিতার মৃত্যুর নেপথ্যে রহস্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন তার মা মরিয়ম বেগম। মেয়ের মৃত্যুকে তিনি আত্মহত্যা বলতে রাজি হননি। গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, সকাল পৌনে ৭টার দিকে রাজধানী গুলশান-২ এর ১০৪ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়ির ৬ষ্ঠ তলার ফ্ল্যাট থেকে মিতা নূরের লাশটি উদ্ধার করা হয়। গুলশান লেক ঘেঁষা এই অ্যাপার্টমেন্টটির নাম প্রাসাদ লেক ভ্যালী। ফ্ল্যাটটি মিতা নূরের স্বামী শাহনূর রহমান মজুমদার ওরফে রানার নামে কেনা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে একবার পুলিশ মধ্যস্থতাও করেছিল। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।’ এদিকে মিতা নূরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের নাট্যাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকর্মীরা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। তবে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জানিয়েছেন, মিতার মধ্যে কখনই তারা আত্মহত্যা করার প্রবণতা দেখতে পাননি । গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, লাশ ঘিরে আহাজারি করছেন মিতা নূরের মা ও স্বজনরা। বিলাপ করে মরিয়ম বেগম বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। সে সব সময় হাসি-খুশি ছিল। তার মধ্যে আত্মহত্যার কোন লক্ষণ ছিল না। কেউ তাকে এই পথে যেতে বাধ্য করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাসার এত লোকজনের মধ্যে আমার মেয়ের মৃত্যু কেউ দেখতে পেলো না। এটি অবিশ্বাস্য। এমন কাণ্ড হতে পারে না।’ এ সময় মিতা নূরের স্বামী শাহনূর একটি কক্ষে দরজা আটকে অবস্থান করছিলেন। দুপুর পর্যন্ত তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি। মিতা নূরের দুই ছেলে শেহজাদ নূর (১৭) ও সাদমান নূর তাহসিনও (১২) মায়ের মৃত্যু কারণ সম্পর্কে কিছুই বলেননি। সরেজমিন মিতা নূরের ফ্ল্যাট ঘুরে দেখা গেছে, ড্রইং রুমের চারপাশে সোফাসেট। এর উচ্চতা প্রায় দুই ফুট। সেই সোফাসেটে দাঁড়িয়ে সহজেই সিলিং ফ্যানের নাগাল পাওয়া যায়। ফ্ল্যাটে প্রবেশের মূল দরজা ছিল ভেজানো। ভেতর থেকে খোলা ছিল সিটকিনি। ঐ রুম ছাড়া বাকি চার রুমেই লোকজনের উপস্থিতি ছিল। গুলশান থানার ওসি মিতা নূরের মৃত্যু রহস্যজনক উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, আগে থেকেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল। কয়েকদিন আগেও মিতা নূর তার স্বামীর অফিসে গিয়ে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ডেকে নেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এমন অবস্থায় মৃত্যু তাই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ জানায়, সম্প্রতি মিতা নূরের ছোট বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে গিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে শাহনূরকে যেতে বললেও তিনি যাননি। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বাধে। একপর্যায়ে মিতা নূর তার স্বামীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। পরে তার অফিসে গিয়ে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আসবাব-পত্র তছনছ করেন। একপর্যায়ে পুলিশ হাজির হয়ে দু’জনের দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন গুলশান থানার ওসি (তদন্ত) নূরে আযম। মিতার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, মিরপুরে লিয়াং ফ্যাশন ও ইমিনেজ ডিজাইন নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের (সিইও) মালিক শাহনূর রহমান মজুমদার ওরফে রানা। দুপুর পর্যন্ত গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা না বললেও তিনি বিকালের দিকে মুখ খোলেন। তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী মিতা নূর আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু কি কারণে করেছেন তিনি সেটা জানেন না। রাতে এক সাথে ঘুমিয়েছিলেন। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতে পান, পাশে তার স্ত্রী নেই। এ ঘর ও ঘর খুঁজে ড্রইং রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, তার স্ত্রী ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে আছে। এরপর নিজেই গুলশান থানায় ফোন করেন। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। আরও দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মিতা! মিতা নূরের পিতা ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ২৩ বছর আগে কলেজে অধ্যয়নকালে মিতা নূর পালিয়ে বিয়ে করেন শাহ নূর রহমান মজুমদার রানাকে। তবে তার মেয়েকে মাঝে-মধ্যেই নির্যাতন করা হতো। নির্যাতন সইতে না পেরে সে আগেও দুই বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে হাসপাতালে নিয়ে তার পাকস্থলি ওয়াশ করা হয়েছে। তিনি জানান, তাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার লুটেরচর গ্রামে। স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন তিতাস রোডের পশ্চিম নন্দিপাড়া এলাকার একটি বাড়িতে তিনি বসবাস করেন। এদিকে মিতা নূরের মৃত্য রহস্য উদঘাটনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ কয়েক ধরনের আলামত সংরক্ষণ করেছে বলে জানা গেছে। সিআইডির ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন বলেন, পরীক্ষার জন্য মিতা নূরের ওড়না, মুখের লালা ও বিশেষ অঙ্গের আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব আলামত পরীক্ষার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। মিতা নূরের মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গুলশান থানার এসআই আনোয়ারা খাতুন বলেন, লাশের বাম পায়ের গোড়ালিতে পুরনো জখমের দাগ পাওয়া গেছে। সুরতহাল পরীক্ষায় আত্মহত্যার লক্ষণ প্রতীয়মান হয়েছে, তবে হত্যাজনিত কোন লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।