বাংলাদেশি পোশাকের বড় বাজার হতে যাচ্ছে চীন
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৮
পোশাক রপ্তানিতে একসময় চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল যে বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশই এখন চীনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করছে। শুধু তাই নয়, একবছরের ব্যবধানে চীনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দ্বিগুন হয়েছে। মূলত: ইউরোপের বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চীনে তাদের আউটলেট খোলার কারণে রপ্তানিতে এ প্রবৃদ্ধি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতাও চীনে তাদের শাখা খুলছে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা ক্রেতাদের অর্ডারের একটি অংশ চীনে পাঠিয়ে দিচ্ছে। চীনের তরুণ-তরুণীরা ক্রমেই ফ্যাশন সচেতন হয়ে ওঠায় ব্র্যান্ড শপগুলো চীনে তাদের শাখা খুলছে।
কেউ কেউ বলছেন, চীনের শ্রমমূল্য বৃদ্ধির কারণে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই সে দেশের ব্যবসায়ীরা এখন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক কিনতে শুরু করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৫ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলারের পোশাক চীনে রপ্তানি করেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৪৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের (২০১২-১৩) জুলাই থেকে মে পর্যন্ত এ ১১ মাসে চীনের বাজারে পোশাক রপ্তানি হয়েছে সাড়ে ১২ কোটি ডলারের।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চীনের শ্রমমূল্য বেড়ে যাওয়ায় সেখানে পণ্যের উত্পাদন খরচ অনেক বেশি। মূলত: চীনা নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বেড়ে গেছে, ফলে তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ও বেড়েছে। দেশটি যে খরচে পোশাক উত্পাদন করে তা কেনার সামর্থ্য অনেকের নেই। এজন্য চীনের বাজারে কম খরচে উত্পাদিত পোশাকের চাহিদা অনেক বেশি। চীনের অনেক ব্যবসায়ী কম খরচে পোশাক আমদানির জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, চীন এখন ‘এক সন্তান পলিসি’ গ্রহণ করেছে। এ কারণে সেখানে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর দেশটির দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই এখন আর টেক্সটাইল ব্যবসায় থাকতে চাইছে না। তারা এখন বিকল্প ব্যবসার দিকে ঝুঁকছে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ১৩৫ কোটি মানুষের দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক। চীনের ৩১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে পোশাক রপ্তানি করা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা সহজ হয়ে উঠছে। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, চীনে মাত্র ৬ দিনের মধ্যে জাহাজযোগে পণ্য পাঠানো যায়।
পোশাক রপ্তানির দিক দিয়ে চীনের অবস্থান এখনো বিশ্বে প্রথম। এর পরের অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। উদ্যোক্তরা বলছেন, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের মাত্র ১০ শতাংশ দখল করতে পারলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
তবে বিজিএমইএ সভাপতির এ বক্তব্যের সাথে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেছেন সংগঠনটির সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন। তিনি বলেন, ইউরোপের যেসব ক্রেতা বাংলাদেশে অর্ডার দেয়, তারা কিছু পণ্য চীনে শিপমেন্ট করার আদেশ দেয়। কারণ সেখানে অনেক চেইন শপই এখন শাখা খুলেছে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড হুগো বস চীনে এ পর্যন্ত পাঁচশটিরও বেশি শাখা খুলেছে বলে তিনি জানান। এবিএম সামছুদ্দিন আরো বলেন, শুধু চীন নয়, ভারতেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। সেখানেও বড় বড় ক্রেতারা তাদের শাখা খুলছেন।
জানা গেছে, চীনের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে শুধু পোশাক আমদানিই করছে না, অনেক ব্যবসায়ী তাদের কারখানা বাংলাদেশে সরিয়ে আনছেন। সেখানকার শ্রমিকদের বেতন বেশি হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা এ কাজটি করছেন বলে জানা গেছে। সমপ্রতি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করায় চীনের উদ্যোক্তরাও এখন ভয়ের মধ্যে আছেন। তবে বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি এবএিম সামছুদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, চীনা উদ্যোক্তারা এখানকার সস্তা শ্রম ব্যবহার করছেন ঠিকই কিন্তু পোশাক উত্পাদনের জন্য যে কাপড় তারা দেশ থেকে নিয়ে আসেন সেগুলোর দাম ইচ্ছে করে বেশি দেখানো হয়। এর ফলে তারা বাংলাদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সরিয়ে নিচ্ছেন। বিষয়টির ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, একজন চীনা উদ্যোক্তা এখানে পোশাক কারখানার মালিক হলেও চীনে তার বস্ত্র কারখানা আছে। সেখান থেকে সে এলসির মাধ্যমে বেশি দামে কাপড় নিয়ে আসেন। পরে রপ্তানি বিলের সাথে তা সমন্বয় করে বাড়তি অর্থসহ কাপড়ের মূল্য নিজ দেশে ফেরত পাঠান।