ক্ষয়িষ্ণু উপজাতি রাখাইন
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৪
বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলায় বসবাস করা রাখাইন নামের এক ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, গৌরবময় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের অধিকারী হয়েও এদেশের অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মতো বেশকিছু সংকটের মুখোমুখি হয়ে সেই রাখাইন সম্প্রদায় এখন এক ক্ষয়িষ্ণু উপজাতিতে পরিণত হয়েছে।
সোয়া দু’শ বছরেরও বেশি আগে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা এই রাখাইন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, ধর্ম এবং জাতিগত প্রভেদ এই অঞ্চলের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী এবং রাখাইনদের মধ্যে অনেকটা দূরত্ব সৃষ্টি করে। তাছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জায়গাজমি বেহাত হয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও ভাষাগত কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা তাদেরকে অনেকটা পরিণত করেছে এই ক্ষয়িষ্ণু উপজাতিতে। এখন অনেকটা তাদের মানসিকতায় কাজ করে ‘নিজভূমে পরবাসী’র মতো। পরিচিতির ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অন্য অধিবাসীদের কাছে বিভিন্ন সময়ে ‘মগ’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু, এই নামে পরিচিত হতে তারা অনেকটা ঘৃণা বোধ করে। এসম্পর্কে বিভিন্ন মতামত থাকলেও তাদের মতে, রাখাইন শব্দটি পলি ভাষা হতে রক্ষাইন, রাখাইন উত্পত্তি লাভ করেছে। এর মানে রক্ষণশীল জাতি। রাখাইন জাতির আবির্ভাব হয় খৃষ্টপূর্ব ৩৩১৫ বছর আগে। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, ১৭৮৪ সালে এই দক্ষিণাঞ্চলে রাখাইনদের আগমন ঘটে। বার্মিজ রাজা ‘বোদোপ্রা’ আরাকান রাজ্য জয় করার পর পরই বিপুল সংখ্যক রাখাইন সমপ্রদায়ের লোক প্রাণ ভয়ে স্থল ও জল পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আরাকানের মেঘবতির সান্ধ্যে জেলার কোন এক নির্জন স্থান থেকে দেড়’শ রাখাইন পরিবার বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় পঞ্চাশটি নৌকাযোগে অজানার উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেয়। তিন দিন ও তিন রাত পাড়ি দিয়ে কূলের সন্ধান পায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী দ্বীপে। গভীর অরণ্যে ঘেরা জনমানবহীন হিংস্র জীব-জন্তুর বিপদসংকুল এই সমুদ্র দ্বীপ রাঙ্গাবালীর জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করে এবং তাদের সঙ্গে করে আনা ধান ও ফল-মূলের বীজ বপন করে সেখানে জমি আবাদ শুরু করে। এদের তিনটি গ্রুপের নেতৃত্বদানকারী প্রধানগণ ছিলেন ক্যাপ্টেন প্যোঅং, উঃগোম্বাগ্রী ও অক্যো চৌধুরী। কয়েক বছর পর কাছাকাছি মৌডুবির চরে তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ বিবেচনায় তারা রাঙ্গাবালী ছেড়ে চলে যান মৌডুবিতে। পরবর্তীতে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নতুন ভূমির সন্ধান করে এবং ক্রমান্বয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ে বড়বাইশদিয়া, ছোটবাইশদিয়া, কুয়াকাটা, টিয়াখালী, বালিয়াতলী, বগীসহ বিভিন্ন দ্বীপ এলাকায়। এরা পৌঁছার আগে ঐসকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমুদ্র দ্বীপ ছিল গভীর অরণ্যে ঘেরা। এরা প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে ঐসকল এলাকায় বসবাস করে এবং জঙ্গল কেটে আবাদী জমিতে পরিণত করে। ১৯৪৫ খৃীষ্টাব্দের এক হিসাব অনুযায়ী বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলায় রাখাইন জনসংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ২৫ হাজারে এবং তাদের পাড়ার সংখ্যা ছিল ২২০টি।
জানমালের নিরাপত্তার জন্য সোয়া দু’শ বছরেরও বেশি আগে এই অঞ্চলে আশ্রয় নেয়া রাখাইন সমপ্রদায় আজ রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমানে বৃহত্তর পটুয়াখালীতে (বরগুনা জেলাসহ) রাখাইন জনসংখ্যা ৪ হাজারের বেশি নয়। ক্রমাগত বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে তাদের অনেক বসতি এলাকা প্রায় বিরাণ হয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অনেক পরিবার। সর্বস্বহারা হয় অনেক পরিবার। বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগে খোয়া যায় তাদেরকে তত্কালীন কলোনাইজেশন অফিসারের দেয় ভূমি অধিকারের দলিল ও কাগজপত্র। এই সুযোগ গ্রহণ করে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মানুষ ও ভূমিদস্যুরা। তারা অনেকে অন্যায়ভাবে দখল করে নেয় রাখাইনদের সম্পত্তি। তাদের অনেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করে ঐসব সম্পত্তির কাগজপত্র। ভয়ভীতি ও মামলা-মোকর্দমায় জড়িয়ে বেঁচে থাকা অনেক পরিবার এলাকা ত্যাগ করে চলে যায় অন্যত্র। যাদের অদম্য চেষ্টায় দক্ষিণের সাগর পাড়ের অনেক এলাকায় জনবসতি গড়ে ওঠে, পরিণত হয় আবাদী ভূমিতে তারাই এখন সেখানে অস্তিত্ব সংকটে।