পাষাণময়ী কালীবাড়ির রোমাঞ্চকর ইতিহাস
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৭
কালের সাক্ষী হয়ে আছে জমিদারী আমলের পটুয়াখালীর পাষাণময়ী কালীবাড়ি। একসময় এখানে ভাদ্র ও চৈত্রের অমাবশ্যা তিথিতে বিশাল আয়োজন হতো কালী পূজার। কলসকাঠী থেকে আসতেন জমিদাররা। তারা উঠতেন সংলগ্ন কাছারি বাড়িতে। কয়েকদিন ধরে চলত মহাধুমধাম আর আনন্দ-উল্ল¬াস। সেই জমিদারও নেই, নেই তেমন ধুমধাম। তবে এখনও টিকে আছে নিত্য পূজা-অর্চনা ও ভাদ্রের অমাবশ্যার কালী পূজা। এখানে ধর্মীয় মানসে শত শত হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকের আগমন ঘটে। অথচ, তাদের অনেকের কাছেই অজানা রয়েছে ‘পঞ্চ চন্ডালের মুন্ডের উপর প্রতিষ্ঠিত’ এই পাষাণময়ী কালীবাড়ির রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
পটুয়াখালী শহরের নতুন বাজার একোয়ারস্টেট বর্তমানে সদর উপজেলা ভূমি ও রাজস্ব অফিস ভবনের কয়েক গজ সম্মুখে পাষাণময়ী কালীবাড়ি। দেয়াল ঘেরা এই এলাকাটি একসময় পরিচিত ছিল জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর কাছারি বাড়ি হিসেবে। তার পিতা বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী বাংলা ১৩১১ সালের ৩০ চৈত্র চতুর্দশী অমাবশ্যা তিথিতে এই পাষাণময়ী কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। মূল মন্দিরের সম্মুখের দেয়ালে শ্বেত পাথরে লিপিবদ্ধ আছে বিগ্রহ স্থাপন ও মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।
শিলালিপিতে উত্কীর্ণ রয়েছে, বাংলা ১২৯৬ সনে কলসকাঠীর জমিদার বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী তত্কালীন পটুয়াখালী মহকুমার কালিকাপুর তালুক খরিদ করেন। এদিকে, ব্রজকান্ড রায় চৌধুরী নামে অপর একজন জমিদার এই তালুক খরিদের এক ভাক্ত কবলা জাহির করেন। এনিয়ে প্রায় এক দশক ধরে চলে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা। বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী মানত করেন, ঐ সকল মোকর্দমায় জয়লাভ করলে তার পটুয়াখালীস্থ নিজ বাড়িতে স্থাপন করেন পাষাণময়ী কালী মাতার বিগ্রহ। মামলা গড়ায় হাইকোর্টে। জয়ী হন বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী।
বাংলা ১৩০৬ সালে জমিদার বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী তার লোকদের আদেশ দেন কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার সকল আয়োজনের। ইসিবপুর নিবাসী স্বরূপ চন্দ্র দে রাজমিস্ত্রী দ্বারা মন্দির নির্মাণ করে তার মধ্যে শ্মশান প্রস্তুত করা হয়। ঐ শ্মশানে ১৩০৮ সালের ২৪ অগ্রহায়ণ মঙ্গলবার কলেরায় মৃত গুরুচরণ কর্মকার নামে এক ব্যক্তির শবদাহ করা হয়। এদিকে নায়েব চন্দ্র কুমার সরকার কলিকাতা থেকে তৈরি করে ১৩০৭ সালের ১৮ আশ্বিন কলসকাঠীতে আনেন কালী মাতার বিগ্রহ। ৫ বছর ৮ মাস ১১ দিন পর ১৩১৩ সালের ২৯ জ্যৈষ্ঠ কলসকাঠী থেকে পটুয়াখালীর এই মন্দিরে আনা হয় কালী মাতার বিগ্রহ এবং তা ৮ বছর ১০ মাস বিনা প্রতিষ্ঠায় থাকে। অভ্যন্তরে তৈরি করা হয় একটি বেদী। জমিদারের হাতের মাপের সোয়া হাত পরিমিত বেদীর চার কোণে ও মাঝখানে মোট ৫টি গর্ত করা হয়। তাতে স্থাপন করা হয় পুরুষ জাতীয় ৫টি জারজ চন্ডালের মুন্ড (খাপড়া শাস্ত্র মতে)। পঞ্চমন্ডী স্থাপন করে “ ঁক্রী” মন্ত্রে কালী নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় কালী মাতাকে। অবশেষে ১৩২১ সালের ৩০ চৈত্র অমাবশ্যা তিথিতে মহা বিষুব সংক্রান্তি দিবসে অভ্যুদায়িক পৌরানিক মতে ঐ মন্দিরে কালী মাতার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় তন্ত্রমতে। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে জমিদার বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী তার পাঁচ পুত্র রাজেশ্বর রায় চৌধুরী (পরবর্তী জমিদার), রত্নেশ্বর রায় চৌধুরী, সিদ্ধেশ্বর রায় চৌধুরী, অমরেশ্বর রায় চৌধুরী, হরেশ্বর রায় চৌধুরীসহ আত্মীয়-স্বজন বরিশাল থেকে লঞ্চ নিয়ে আসেন পটুয়াখালীতে। এ অনুষ্ঠানে জমিদারী স্টেটের সর্বপ্রধান কর্মচারী পেনশনপ্রাপ্ত ডেপুটি কালেক্টর রায় প্যারি মোহন বসু জজ কোর্টের উকিল উমেশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ তত্কালীন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় তিনজন পুরোহিত রোহিনী কুমার চক্রবর্তী, মনোরঞ্জন চক্রবর্তী ও ভবরঞ্জন চক্রবর্তীকে নিযুক্ত করা হয় অমাবশ্যার পূজা ও দৈনিক পূজা করার জন্য। শতাব্দীকালের পুরানো এই মন্দিরটি আজো টিকে আছে ভক্তদের দক্ষিণা ও দান-অনুদানে।