দুমকীর জানা-অজানা

অনেক জায়গায় মাটি কেটে গভীরে গেলে পলি মাটির স্তর ভাঙ্গা হাড়িপাতিল এমনকি বাঁশ ঝাড়, গোলপাতা ও অনেক মঠমন্দির ও কাঠের নির্দশন পাওয়া যায়। এছাড়াও সে যুগের শান বাঁধানো ঘাটের দীঘি ও পুরাকীর্তি ইতিমধ্যেই অনেক স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে দুমকী নামটি সম্পর্কে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যতটুকু জানা যায়, তা হলো দুমকী নামটির উত্পত্তি মূলত দ্বি-মুখী। প্রতিটি গ্রাম বা এলাকায় নামগুলো আজও প্রচলিত আছে। কাল ও সময়ের পরিবর্তন ও বিবর্তনের ফলে বা নামটিকে সৌন্দর্য ও শ্রুতিমধুর করার লক্ষ্যে বা কোন ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে আজকে দুমকী মানচিত্রে স্থান পেয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখন এ অঞ্চল চন্দ দ্বীপ রাজ্য নামেই প্রসিদ্ধ ছিল। তত্কালে হিন্দু রাজাই এ অঞ্চল শাসন করত। বর্তমানে লোহালিয়া নদীর পশ্চিম পাড়ের এ অংশ বর্তমান দুমকী উপজেলা এলাকায় ছিল চিত্রকর, সুতা বিক্রয়কারী এবং হাড়িপাতিল তৈরি ও বাজারজাতকরণের জন্য প্রসিদ্ধ। আজকের এ দুমকী উপজেলার মধ্য দিয়েই ছিল অজস ছোট-বড় নদীনালা খাল। যা পরবর্তীতে পলিমাটি পড়ে চর জেগে ওঠে এবং আস্তে আস্তে তাতে জনবসতি গড়ে ওঠে। তাই আজও অনেক জায়গায় মাটি কেটে গভীরে গেলে পলি মাটির স্তর ভাঙ্গা হাড়িপাতিল এমনকি বাঁশ ঝাড়, গোলপাতা ও অনেক মঠমন্দির ও কাঠের নির্দশন পাওয়া যায়। এছাড়াও সে যুগের শান বাঁধানো ঘাটের দীঘি ও পুরাকীর্তি ইতিমধ্যেই অনেক স্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে। এ অঞ্চলকে এক সময় শস্যভান্ডার বলা হত। এখানে বিভিন্ন জাতের ও বিভিন্ন নামের প্রচুর ধানের আবাদ হতো। মোটা ধান, চিকন ধান, চিংগর ভাসি, বাঁশ বহরি, লতা শাইল, কাটা বহরি, শাক্কর খানা আরও কত নামের কত ধান ছিল। বরিশালের বিখ্যাত বালাম চাল ছিল দুমকী এলাকার গর্ব ও অহংকার। বড় বড় চাল ব্যবসায়ীর হাজার হাজার মণের নৌকা ও খাসি নৌকার মেলা জমত। বালাম চালের জন্য ছিল এক বিরাট প্রতিযোগিতা। সে দিনগুলোতে হাজারো নৌকার ভিড় ছিল। এক নৌকা থেকে অন্য নৌকা দিয়ে বড় বড় নদী পাড়ি দেয়া যেত। যদিও আজ এ কথা গল্পের মত মনে হয়। কিন্তু একদিন তা ছিল বাস্তব। এক সময় আজকের এ দুমকী ছিল একটি অজও পাড়াগাঁ। যেখানে আজ বড় বড় বিল্ডিং, রাস্তাঘাট, পুল, ব্রিজ দেখা যায়, সেখানে তিন তক্তার নৌকা, তালের কোশ আর পানির গামছা ছিল সকলের নিত্যসঙ্গী। রাস্তাঘাট ছিল না। বনজঙ্গলে ভরা ছিল এ অঞ্চল। কালের বিবর্তনে অন্যান্য এলাকার মত অত্র এলাকারও পরিবর্তন ঘটেছে। আজ দুমকী থানা ও উপজেলায় রূপান্তর ও উন্নীত হয়েছে। দুমকীর কৃতি সন্তান সাবেক কেবিনেট সচিব ও মন্ত্রী মরহুম এম. কেরামত আলীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই এলাকাবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে, শুরু হয়েছে এলাকার উন্নয়ন। পটুয়াখালী জেলাধীন দুমকী উপজেলা জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ মাইল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। যার উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে রয়েছে বিশাল লোহালিয়া, পায়রা ও পান্ডব নদী। যার জনসংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার। আয়তন ৯২.৫২ বর্গকি:মি:। ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে এই উপজেলা গঠিত। প্রথমত এখানে ছিল দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি বিদ্যাপীঠ পটুয়াখালী কৃষি কলেজ। যার প্রতিষ্ঠাতা সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব ও মন্ত্রী এম. কেরামত আলী। যা বর্তমানে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। দুমকী পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় উন্নীত হয় ২০০০ সনের ৮ জুলাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে। একই দিনে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েরও ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি। দুমকী উপজেলা একদিন অজপাড়াগাঁ থাকলেও আজ তা রাস্তাঘাট, পুল, ব্রিজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ এক অঞ্চল। রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজ মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে দুমকী এক নতুন দিগন্তে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় উপজেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়, ১২টি কলেজ, ২৩টি মাদ্রাসা, ২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৫৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য কওমী ও নূরানী মাদ্রাসা রয়েছে। দুমকী উপজেলার হাটবাজারগুলোর মধ্যে লেবুখালী বাজার, পীরতলা বাজার, গাবতলীর জামলা বাজার, তালতলীর হাট, পুরাতন কদমতলা বাজার, আংগারিয়া বন্দর, বোর্ডঅফিস বাজার, মজুমদার বাড়ীর বাজার, কলবাড়ীর বাজার ও ধোপারহাট বাজারগুলো বেশিরভাগই পরিচিত। এ বাজারগুলোতে অনেক দোকানপাট দিয়ে লাভবান হয়েছে ভোক্তভোগী পরিবার। লেবুখালী বাজার এ এলাকার নামকরা ছিল একসময়। সুদূর কোলকাতা থেকে বালাম চাল সংগ্রহের জন্য চলে আসত এ বাজারে। কিন্তু বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এ বাজারটি। এমনকি এ বাজারের রশি শিল্পের অস্তিত্ব বিলীনের পথে। দুমকী উপজেলার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে আংগারিয়া ইউনিয়নের কোন্ডমালার দীঘি ও মহারাজ বাড়ী দু’টি স্থান প্রসিদ্ধ ছিল। কোন্ডমালার দীঘি ও মহারাজ বাড়ীর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। তখনকার সময়ে মহারাজ শিবপ্রসাদ শুকুল ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এলাকার কল্যাণে তার যথেষ্ট অবদান ছিল। আর কোন্ডমালার দীঘিতে তখনকার সময়ের আঞ্চলিক ভাষায় মেজবান এর থালাবাসন ভেসে উঠত আপন মনে। কেউ দুষ্টুমি করে নিলে তার বিভিন্ন সমস্যা হয়ে যেত। লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারগাছিয়া এবং কার্তিকপাশা দীঘি সাক্ষী হয়ে আছে কালের বিবর্তনে। আঠারগাছিয়ার নাম শুনে অনেকেই আতঙ্ক আঁতকে উঠত। আঠারগাছিয়ায় এক সময় আঠারটি দীঘি কাটা হয়েছিল।