সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র সোনারচর
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ১৯:৫১
প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি পর্যটনের অমিত সম্ভাবনাময় সোনারচর। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার দক্ষিণ সীমানায় বঙ্গোপসাগরের একেবারে কোল ঘেঁষে এর অবস্থান। এখানে সবুজ প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী, পাখির ঝাঁক, জেলেদের উচ্ছ্বাস আর সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি মিলে নয়নাভিরাম এক সৌন্দর্যের জগত্ সৃষ্টি হয়েছে। সাগরে যখন জোয়ারের পানি উথলে ওঠে তখন অনন্য এক সৌন্দর্য বিকশিত হয় সোনারচরে। তটরেখায় আছড়ে পড়ে ছোট-বড় ঢেউ। প্রায় দশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং পাঁচ কিলোমিটার প্রস্থের দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার রয়েছে সুযোগ। ঢেউয়ের তালে তালে দুলতে থাকা জেলে নৌকার বহর। সাগরে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। বিশেষ করে প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এর আবেদন অন্য রকমের।
সোনারচর নামের উত্পত্তি
সোনারচরে সোনা নেই, আছে সোনা রঙের বালি। সকাল কিংবা শেষ বিকেলের রোদের আলো যখন সোনারচরের বেলেভূমিতে পড়ে, তখন দূর থেকে পুরো দ্বীপটাকে সোনালী রঙের থালার মতো মনে হয়। বালুর ওপরে সূর্যের আলোয় চোখের দৃষ্টি চিক চিক করে ওঠে। মনে হবে যেন কাঁচা সোনার প্রলেপ দেয়া হয়েছে দ্বীপটিতে। ধারণা করা হয়, বিশেষ এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই দ্বীপটির নাম রাখা হয়েছে সোনারচর। আবার কারও কারও মতে এক সময়ে দ্বীপটিতে প্রচুর সোনালী ধান জন্মাতো, সে কারণেই এর নাম সোনারচর।
কিভাবে যওয়া যাবে সেখানে
সোনারচরে বিভিন্ন পথে যাওয়া যায়। তবে সরাসরি সড়ক কিংবা নৌপথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। ঢাকা থেকে আছে বাস ও লঞ্চের ব্যবস্থা। পটুয়াখালী থেকে গলাচিপা হয়ে আগুনমুখা মোহনা, ডিগ্রি, বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিয়ে দু’পাশে ঘন ম্যানগ্রোভ গাছের বাগান। ট্রলার কিংবা লঞ্চ যোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ— চর তাপসী। তাপসীর বাঁকে পৌঁছাতেই সোনার চরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগুলেই সোনারচর। স্পিড-বোট নিয়েও যাওয়া যেতে পারে সোনারচরে। গলাচিপা লঞ্চঘাট থেকে স্পিড বোটে সোনার চরে যেতে সময় লাগে মাত্র দেড় ঘণ্টা। আবার কুয়াকাটা থেকেও সোনারচরে যাওয়া যেতে পারে। যেতে হবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে। ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে সময় লাগবে ঘণ্টা তিনেক।
সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত অবলোকন
সোনারচরে রয়েছে প্রায় দশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং পাঁচ কিলোমিটার প্রস্থের বিশাল সমুদ্র সৈকত। সৈকতের যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার রয়েছে অপূর্ব সুযোগ। এখানে রয়েছে পাঁচ হাজার একরের বিশাল বনভূমি। সম্ভবত সুন্দরবনের পরেই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সোনারচরের বিশাল বনভূমির মধ্যে ছড়িয়ে আছে দেড় শতাধিক ছোট-বড় খাল। ছোট্ট নৌকা বা ইঞ্জিন চালিত ট্রলার নিয়ে এসব খালে ভেসে ভেসে দেখা যায় বিচিত্র সব পাখ-পাখালীর বিচরণ। প্রচুর সংখ্যক হরিণ আর বানর রয়েছে সোনারচরে। বনাঞ্চলের কাছাকাছি গেলে হয়তো সহজেই চোখে পড়বে বন্য গরু ও মোষ। এখানে রয়েছে শুকর, বানর, মেছো-বাঘসহ আরও বিচিত্র সব বন্য প্রাণী। শীতের সময় বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় পুরো দ্বীপ ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। সোনারচর বনাঞ্চলে সামপ্রতিক বছরগুলোতে ম্যানগ্রোভের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের গাছপালার বাগান সৃজন করা হয়েছে। শীত ও শুকনো মৌসুমে এখানে গেলে দেখা মিলবে হাজারো জেলের। শুঁটকি পল্লীতেও ঘুরে বেড়ানো যাবে। দেখা যাবে লাল কাঁকড়া যেন চাদর বিছিয়ে রেখেছে। মোট কথা, একদিকে দূর আকাশ বিস্তীর্ণ সাগর এবং বনাঞ্চল। দুটিরই স্বাদ মিলবে সোনারচরে। সে সঙ্গে বন্যপ্রাণী আর পাখির কলরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য পিপাসুরা সোনারচরের রূপে মুগ্ধ হবেন।
কোথায় থাকবেন
সোনারচরে রাত কাটানোর মতো নিরাপদ আরামদায়ক কোন ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। ইচ্ছে করলে রাতে সেখানে থাকতে পারেন। এছাড়া রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। সেখানে কিছুটা কষ্ট হলেও রয়েছে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। চাইলে সূর্যাস্ত দেখার পর ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা ট্রলারে ৩০ মিনিটে চলে যেতে পারেন চরমোন্তাজে। সেখানে রয়েছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ বাংলাদেশ ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির ব্যবস্থাপনায় রাত যাপনের মতো মোটামুটি সুবিধাসম্পন্ন বাংলো। রয়েছে হোটেল। চরমোন্তাজে রাত কাটিয়ে সোনারচরের পাশেই মৌডুবী, জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিপচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে।