ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৩
দেখিতে দেখিতে শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছে বাংলাদেশের গৌরব পতাকাবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হইয়াছিল ১৯২১ সালের ১লা জুলাই। সময়ের হিসাবে ৯২ বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। সেই সাথে সমৃদ্ধ হইয়াছে তাহার সাফল্য ও অর্জনের ভাণ্ডার। আর ইহার প্রভাব যে কী বিশাল ও বহুমাত্রিক—তাহাও দেশবাসীর অজানা নহে। কারণ তাহারা নিজেরাও এই অর্জনের গর্বিত অংশীদার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রায় সর্বত্রই ছড়াইয়া আছে ইহার অজস্র দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশশাসিত ভারতে মাত্র ৩টি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং ৩টি আবাসিক হল লইয়া যাহার যাত্রা শুরু হইয়াছিল, আজ সেইখানে ১৩টি অনুষদের অধীনে ৭২টি বিভাগে শিক্ষা গ্রহণ করিতেছে প্রায় ৪৮ হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষকের সংখ্যাও এখন দুই হাজারের কাছাকাছি। এই যাত্রাপথটি যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল—এমন নহে। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, এই ৯২ বত্সরের মধ্যে ৫০ বত্সরই বাংলাদেশ ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ফলে জন্মলগ্ন হইতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হইতে হইয়াছে পদে পদে। অতিক্রম করিতে হইয়াছে প্রতিকূলতার পাহাড়। সুখের বিষয় হইল, সকল প্রতিকূলতাকে জয় করিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু যে নিজেকে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছে তাহাই নহে, সেই সাথে স্বদেশের স্বাধীনতাসহ সর্বপ্রকার অধিকার অর্জনেও পালন করিয়াছে অনন্য ভূমিকা।
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস ও লিভারপুলের মতো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অচিরেই ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল। ইহার সুনাম ছড়াইয়া পড়িয়াছিল সারা বিশ্বে। একদিকে যেমন দেশিবিদেশি বহু জ্ঞানতাপসের বিরল নেতৃত্বধন্য হইয়াছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তেমনি অসংখ্য আলোকিত মানুষেরও জন্ম দিয়াছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। তন্মধ্যে নানা ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নহে। তাহারা নিজেরা যেমন আলোকিত হইয়াছেন, তেমনি দশকের পর দশক ধরিয়া আলোকিত করিয়া চলিয়াছেন বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। ‘বাংলাপিডিয়া’য় প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের ৭০ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে আগত। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই প্রভাব যে কতোখানি নিয়ামক—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন হইতে শুরু করিয়া মুক্তিযুদ্ধ অবধি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ শুধু যে নেতৃত্ব দিয়াছেন তাহাই নহে, বিপুল ত্যাগ স্বীকারও করিয়াছেন। অকাতরে উত্সর্গ করিয়াছেন জীবন। সেই তালিকাও কম দীর্ঘ নহে। স্বাধীনতার আগে ও পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা বারবার স্বৈরশাসকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হইয়াছেন। কিন্তু মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কখনই আপস করেন নাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঐতিহ্য ও গৌরবের পতাকাকে সমুন্নত রাখাই যে আজকের সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জ—তাহা নির্দ্বিধায় বলা চলে। ইহা অনস্বীকার্য যে, সাম্প্রতিককালে বিশ্ববিদ্যালয়টি সংখ্যাগতভাবে যতোটা স্ফীত হইয়াছে, গুণগত মান সেইভাবে বাড়ে নাই। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছাইয়াও পড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া গবেষণার দৈন্যদশা লইয়া সংবাদপত্রে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হইয়াছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সংকীর্ণ দলীয় বিবেচনা যে জ্ঞান, মেধা ও পেশাদারিত্বকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে—তাহাও কোনো নূতন কথা নহে। উপেক্ষিত হইতেছে অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টিও। ডাকসু নির্বাচন হয় না দীর্ঘদিন। সিনেটও কার্যকর নহে বেশ কিছুদিন যাবত্। এই তালিকা আর দীর্ঘ না করিয়া শুধু এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির গৌরবের প্রতীক। সঙ্গত কারণেই এই প্রতিষ্ঠানটির নিকট দেশবাসীর প্রত্যাশাও অনেক বেশি। পৃথিবী দ্রুত আগাইয়া যাইতেছে। সেই অগ্রযাত্রায় শরিক হইতে হইলে বিশ্বমানের উচ্চতর শিক্ষা ও জ্ঞানের কোনো বিকল্প নাই। আমরা আশা করি, অতীত ঐতিহ্য ও জনগণের প্রত্যাশার আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও বাতিঘরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবে। শতবর্ষ পূর্তিকে সামনে রাখিয়া সম্মিলিতভাবে গ্রহণ করিবে বিশ্বমান অর্জনের চ্যালেঞ্জ।