বাজেটে আঞ্চলিক যোগাযোগের উপর নূতন গুরুত্বারোপ
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৩
এবারের বাজেটের একটি বিশেষ দিক হইল- অনেক বত্সর পর যোগাযোগ খাতে, বিশেষ করিয়া রেল যোগাযোগের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। যখন পদ্মা সেতুর ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়া সরকারকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করিতে হইতেছে তখনই আবার রেলওয়ের উপর বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করিয়া এই খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা একটু আলাদা করিয়া ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি করে। এবারের বাজেটে রেলওয়ে খাতে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হইয়াছে। রেলওয়ের উপর এই নূতন গুরুত্বারোপ কিন্তু ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মাঝে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তন নির্দেশ করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, ভারত আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির সাথে সড়কপথে, বিশেষ করিয়া রেলপথে যোগাযোগ স্থাপন করিতে চাহিতেছে, যাহা অবশ্যই বাংলাদেশের মধ্য দিয়া হইতে হইবে। আর তাহাই যদি হয়, তাহা হইলে এই দেশের রেলপথের উন্নয়ন ঘটাইতে হইবে।
ভারতের আসিয়ান দেশগুলির যোগাযোগ স্থাপনে এই বিশেষ গুরুত্বের কারণ সম্ভবত চীনের আসিয়ান দেশগুলির সাথে যোগাযোগ স্থাপনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ। চীন কুনমিং হইতে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত রেলওয়ে সংযোগ স্থাপন কর্মকাণ্ড শুরু করিয়াছে এবং ইন্দোনেশিয়া নিজ খরচে সিঙ্গাপুর হইতে জাকার্তা পর্যন্ত সেই রেলওয়ে সংযোগ বৃদ্ধি করিবে বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। ফলে চীন যখন আসিয়ানের সাথে সংযুক্ত হইয়া যাইতেছে সেই ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য কৌশলগত গুরুত্বের দিক বিবেচনা করিয়া ভারত এখন মনে করিতেছে যে, তাহার আসিয়ান দেশগুলির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা খুব জরুরি। আমেরিকাও চীনের সাথে ব্যালেন্স করার জন্য হয়তো ভারতের এই যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতেছে। ভারতের আসিয়ান দেশগুলির সাথে সংযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। আর এই গুরুত্বের কারণেই বাংলাদেশের রেলওয়ে ব্যবস্থার উন্নতি দরকার বলিয়াই হয়তোবা সরকার তাহার শেষ বত্সরে আসিয়া নির্বাচনের আগে আগে পদ্মা সেতুর পাশাপাশি রেলওয়ে খাতে বরাদ্দ রাখিয়াছে। যখনই এই রেলওয়ে যোগাযোগ স্থাপিত হইবে তখনই চট্টগ্রামে যে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের কথা চিন্তা করা হইতেছে তাহার প্রয়োজন আরও বাড়িয়া যাইবে। ফলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ যদি আসিয়ান দেশগুলি হইতে শুরু করিয়া অন্যান্য দেশের সাথে অনেক বেশি সংযুক্ত হয়, তবে তাহা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব বহিয়া আনিবে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬-৭ শতাংশ হইতে বাড়ানো কঠিন বলিয়া মনে হইতেছে, সড়ক বা রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এরকম বড় ধরনের উন্নতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অনেক বাড়াইয়া দিতে পারে। ফলে সরকারের রেলওয়ে খাতকে আরও আধুনিকায়ন করা, রেলওয়ের ভগ্নদশা কাটাইয়া উঠার জন্য খরচ করার যে চিন্তা ভাবনা ও প্রচেষ্টা, তাহাকে একটি বৃহত্ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে দেখা যাইতে পারে। বুঝিয়া-শুনিয়া দেশের স্বার্থে যদি এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই কল্যাণ বহিয়া আনিবে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন, ভারত এবং আসিয়ান দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যের সংযোজক হিসেবে ভূমিকা পালন করিতে পারে, তাহা হইলে অবশ্যই তাহা এদেশের অর্থনীতির জন্য ভাল ফল বহিয়া আনিবে এবং বাংলাদেশের বাণিজ্যকে অনেক বাড়াইয়া দিবে। পাশাপাশি, সিঙ্গাপুর কিংবা দুবাই-এর মত সেবা প্রদান করিয়াও অনেক রাজস্ব আয় করিয়া তাহা দিয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তথা উন্নয়ন ত্বরান্বিত করিতে পারিবে।