গাজীপুর-টঙ্গীতে ধারাবাহিক জয় আওয়ামী লীগের ভরসা

গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা নির্বাচনে বারবার জিতেছে আওয়ামী লীগ। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খান টঙ্গীতে ১৮ বছর ধরে চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। গাজীপুর পৌরসভাতেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক গত ২২ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ফলে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলেই বিশ্বাস দলীয় সমর্থকদের। অপরদিকে, ২০০৮ সালের উপজেলা নির্বাচনে জিতেছিল বিএনপি প্রার্থী শাহানশাহ আলম। আর ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এবারের বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান। এর বাইরে গাজীপুরে বিএনপির জয়ের পরিসংখ্যান খুবই ছোট। বিপরীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনেই বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ফলে সিটি নির্বাচনেও সেই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন ঘটবে বলে বিশ্বাস করেন দলের নেতা-কর্মীরা। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান (দোয়াত কলম) ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. এ মান্নান (টেলিভিশন) নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৮ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারের নানা ব্যর্থতা, দুর্নীতি, পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনি, শেয়ারমার্কেট কেলেঙ্কারি, সাভারের রানা প্লাজার ধস, তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ড, হত্যা-গুম, সর্বশেষ জিএসপি সুবিধা বাতিল প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে ভোটারদের অন্য ৪টি সিটি কর্পোরেশনের মতো প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছেন। তারা ধারণা করছেন, এবার আওয়ামী লীগের সাফল্যের দুর্গ তছনছ করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া ১৪ দলের প্রার্থী ১৮ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র থাকাকালে এলাকার মানুষের কল্যাণে তার অবদান, যে সব উন্নয়ন করেছেন, ভবিষ্যতে তিনি কিভাবে নতুন এ মহানগরীকে আধুনিক ও নাগরিক বান্ধব হিসাবে গড়ে তুলবেন তার বিবরণ তুলে ধরে অতীতের ন্যায় আবারো তার উপর আস্থা স্থাপন করার আবেদন জানাচ্ছেন। বিভিন্ন নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ বারবার গাজীপুরে জয়ী হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, গোপালগঞ্জের পর আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হলো গাজীপুর। গাজীপুরকে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলা হয়। আমি আশা করি, গাজীপুরের মানুষ আমাদের ফিরাবে না। শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে গণমানুষের পক্ষের দল হিসাবে আমি এখানে এসেছি। তাই গণমানুষের নেতা হিসাবে আজমতকে ভোট দেয়া উচিত। এমন একজন লোককে বেছে নেয়া প্রয়োজন যিনি সত্ ও যোগ্য। প্রার্থী হিসাবে আজমতের তুলনা হয় না। তার কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। অপরদিকে, অধ্যাপক মান্নানের নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রি. জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ বলেন, বিরোধী দল ও মতের লোকদের উপর সরকার যে নির্যাতন করেছে, আগামী ৬ জুলাই ব্যালটের মাধ্যমে মানুষ তার জবাব দেবে। ৪টি সিটিতে আমরা সরকারকে ৪-০ তে হারিয়েছি। ইনশাআল্লাহ এবার ৫-০ তে হারাতে পারব। প্রচারণায় কেন্দ্রীয় নেতারা: গাজীপুর প্রতিনিধি ও কাপাসিয়া সংবাদদাতা জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে প্রচারণা তুঙ্গে ওঠেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে ঘুম হারাম করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। তারা বিরামহীনভাবে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সিটি এলাকার অলি-গলি চষে বেড়াচ্ছেন। জয়ের জন্য তারা মরিয়া হয়ে প্রচার কাজ করছেন। গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা ১৮ দল ও গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে প্রচারণা ও পথসভায় অংশ নেন। গতকাল মঙ্গলবার ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে মহানগরীর কাশিমপুর, কোনাবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় অংশগ্রহণ করেন। ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম.এ মান্নান স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে গতকাল ছয়দানা, বোর্ড বাজার এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় এবং আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। ইসিতে বিএনপির অভিযোগ: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে এই অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার। প্রায় একঘণ্টা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির দুই সদস্যর প্রতিনিধি দল। এ সময় এমকে আনোয়ারের সঙ্গে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উপস্থিত ছিলেন। মান্নানের ব্যাংক হিসাব জব্দ: বকেয়া কর পরিশোধ না করায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী এম এ মান্নানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সম্প্রতি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গুলশান শাখায় ব্যাংক হিসাব জব্দ করার চিঠি দিয়েছে এনবিআর। সূত্র জানায়, আয়কর ফাঁকি দেয়ার কারণে ক্যাপিটাল প্রোপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক এম এ মান্নানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৮০১ টাকার পুরনো পাওনা পরিশোধ করেননি মান্নান। এর মধ্যে ২০০৭-০৮ কর বর্ষের জন্য বকেয়া রয়েছে ২৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮১ টাকা। বাকি ১৭ হাজার টাকা পাওনা ২০১১-১২ কর বর্ষে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের বকেয়া রাজস্ব পাওনা পরিশোধে নোটিস দেয়ার পরও কোন জবাব না দেয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ১৪৩ ধারা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তবে রাজস্ব পাওনা পরিশোধ করলে ব্যাংক হিসাব খুলে দেয়া হবে বলে সূত্র উল্লেখ করেছে।