সৃজনী শক্তি ও তারুণ্য

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ইউনূস গত রবিবার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক যুব অনুষ্ঠানে তরুণদের সৃজনী শক্তি প্রয়োগের উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। তিনি যথার্থই বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশের আজিকার তরুণেরাই পরিবর্তনের নিয়ামক, পরিবর্তনের শক্তি। আর তাই তাহাদেরকে সৃজনশীলতা প্রয়োগের জন্য আগাইয়া আসিতে হইবে। সত্য বটে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা বিশ্বব্যাপী তাহাদের সৃজনী প্রতিভা ও মেধার স্বাক্ষর রাখিয়া চলিয়াছে। বর্তমানে দেশে যে সংকট বিরাজমান উহা হইতে উত্তরণের জন্যও চাই তরুণদের যথাযথ ভূমিকা। বর্তমানে সেই ভূমিকা মানেই হইতেছে মেধা, মনন ও সৃজনী প্রতিভার তথা মেধার সুনিপুণ প্রয়োগ। তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর এখনকার বিশ্বের ধ্যান-ধারণা চিন্তা-চেতনা এমনকি কর্মধারাও সম্পূর্ণভাবে পাল্টাইয়া যাইতেছে। তাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া চলিতে না পরিলে কেবলই পশ্চাদমুখী হইয়া থাকাই হইবে আমাদের বিধিলিপি। আর তেমন ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়নের এবং শান্তি-স্বস্তির আশা বাতুলতায় পর্যবসিত হইবে বৈ কি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যেরূপ শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি ও উত্কর্ষ সাধিত হইতেছে তাহাতে সৃজনী ক্ষমতাসম্পন্ন তরুণেরাই কেবল পারে উহার প্রকৃত গতি-প্রকৃতির সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে। কেননা, এ যুগের শিশু-কিশোর-তরুণদের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধিই ঘটিয়া থাকে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ঘেরাটোপের মধ্যে। ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চলমান ধারা অনেকটা আপনা-আপনিই এই কিশোর-তরুণদের মেধা-মননে অনায়াসে ধরা দেয়। ইহাতো গেল প্রযুক্তির দিক। আর এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরুণেরা যথেষ্ট ভালও করিতেছে। উন্নত বিশ্বের তরুণেরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করে উহার কিয়দংশও এ দেশের তরুণেরা বলিতে গেলে চোখেই দেখে না। অথচ এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও তাহারা বেশ জোরেশোরেই আগাইয়া যাইতেছে। অধ্যাপক ইউনূস তরুণদের সৃজনী সামর্থ্যের বা সৃজনী শক্তির উপরই গুরুত্ব দিয়াছেন। এই সৃজনী শক্তি কী? ইহার জন্য নিশ্চয়ই বিরাট প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ হইতে হয় না। সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির তরুণেরা একটু মনস্কতার সহিত যদি নিজেদের মধ্যকার সুপ্ত ক্ষমতা বা শক্তিটিকে শনাক্ত করিতে এবং উহাকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহারে উদ্যোগী হয় তাহা হইলেই ব্যক্তিগত জীবনে সাফল্য তো আসিবেই এমনকি উহা প্রকারান্তরে সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করিবে। তাই সৃজনী শক্তির ব্যবহার করিতে পারিলে এ ক্ষেত্রে যে আমাদের বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উদঘাটিত হইবে ইহাতে কোনই সন্দেহের অবকাশ নাই। জ্ঞান বিকাশের জন্য সৃজনী শক্তির প্রয়োজনীয়তাকে কেহই অস্বীকার করিবে না নিশ্চয়ই। নিত্য নূতন ধারণা সৃষ্টি এবং সেই ধারণাকে সার্বিক কল্যাণে প্রয়োগ করার মধ্যেই সৃজনী শক্তির পরিচয়। তারুণ্য এমিনতেই নানান সৃজনী চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রভূমি আর তেমন অবস্থায় যে সকল তরুণ তাহাদের চিন্তা-চেতনার সহিত মেধা-মননের সংযোগ ঘটাইয়া একটা কিছু উদ্ভাবন করিতে সক্ষম তাহারাই সার্থক ও প্রকৃত প্রস্তাবে প্রতিভার বরপুত্র হিসাবে স্বীকৃত হয়। বাংলাদেশের তরুণেরা অতীতেও তাহাদের সৃজনী ক্ষমতার পরিচয় দিয়াছে। বর্তমানেও দিতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহাদের কোন প্রকার সংকীর্ণ কিংবা মতলববাজি চিন্তার মধ্যে আচ্ছন্ন রাখিয়া এক শ্রেণীর স্বার্থপর ও গণবিরোধী লোক দুষ্কর্ম চালাইয়া যায়। ফলে তারুণ্যের আমরা অকাল বিনষ্টি দেখিতে পাই। সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তরুণদের ব্যবহারের দরুন তাহাদের সৃজনী প্রতিভা লুপ্ত হইতে থাকে এবং সমাজে নানাবিধ অপরাধমূলক কাজে তাহাদেরকে জড়াইয়া পড়িতে দেখা যায়। এমতাবস্থায়, তাহাদের সুপ্ত সৃজনী চেতনাকে জাগাইয়া তুলিতে আমাদের সকলেরই কর্তব্য হইতেছে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।