[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

চ্যালেঞ্জের মুখে মিসরের গণতন্ত্র

আরব বসন্তের ঝিরঝিরে বাতাসে ২০১১ সনের শুরু থেকে তাহরির স্কোয়ারে গণতন্ত্রের যে চারা রোপিত হয়েছিল, তা মিসরের আনাচে-কানাচে পত্র-পল্লবে বিকশিত হওয়ার পূর্বেই ৩০ জুনের উত্তাল বিদ্রোহের তাপদাহে দুমড়ে-মুচড়ে পড়েছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ডক্টর মোহাম্মদ মুরসির অভিষেকের মধ্য দিয়ে মিসরে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়। সাথে সাথে মুরসিবিরোধী বিদ্রোহ-বিপ্লব-জালাও-পোড়াও এর কারণে গণতন্ত্রের নক্ষত্রগুলো যেন এক এক করে খসে পড়তে শুরু করে। এমতাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কিভাবে মিসরের নব উদিত গণতন্ত্র লক্ষ্যপানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। মিসরের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ জনসমাগম হয় ৩০ জুন এবং আশংকা করা যাচ্ছে, এ গণজমায়েত আরো বৃহত্ আকার ধারণ করে দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু এ বিপুল জনসমাবেশের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে যে, এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের লড়াই যতটা না বিকশিত হচ্ছে, তারচেয়ে বেশি আলোড়িত হচ্ছে মতাদর্শগত লড়াই। ৩০ বছরের স্বৈরাশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে মিসরের আবাল-বৃদ্ধ- বনিতা যখন তাহরির স্কোয়ারে এসে জড়ো হতে থাকে, তাদের গগনবিদারী ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে যখন তাহরির চত্বর প্রকম্পিত হয়ে উঠে, তাহরিরের বুক চিরে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সারিবদ্ধ শৃংখলা স্নিগ্ধ বিমুগ্ধতা সৃষ্টি করে, তখন বিশ্বব্যাপী প্রত্যাশা ছিল মিসরের গণমানুষের স্বপ্ন হয়ত পূরণ হতে যাচ্ছে। তখন সকলের সামনে ছিল কেবল একটিই প্রত্যয়—গণতন্ত্র। সাদা-কালো-মিশ্র, মুসলিম-খ্রিস্টান, শিয়া-সুন্নি, সেক্যুলার- ইসলামী প্রভৃতি মত-পথের অনুসারীরা গণতান্ত্রিক মিসরের একক পতাকার নিচে সমবেত হতে সক্ষম হয়। দুর্ভাগ্যবশত সেই ভয়ংকার রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রাক্কালেই মিসরীয়রা হীন রাজনৈতিক মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হতে থাকে। গণতন্ত্রের নক্ষত্রপতনের জন্য মিসরের সরকার ও বিরোধী শিবির—সকলের দায়-দায়িত্ব সমান। আবার গণতন্ত্রের প্রতিস্থাপনেও সকলের অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা পূর্বের ন্যায় এখনো দুর্বার, দুর্নিবার, দেদীপ্যমান। তাহরির বিপ্লবের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনসমূহ ছিল মিসরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পূর্বশর্ত। স্বচ্ছ-সুষ্ঠু সেই নির্বাচনগুলোতে যখন একের পর এক মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ (Muslim Brotherhood) বিজয় লাভ করতে থাকলো, তখন অপবাদ ছড়ানো হলো ভোট কারচুপির। অপপ্রচার করা হলো রাজনৈতিক ইসলাম প্রকল্পের, অভিযোগ উত্থাপিত হলো ব্রাদারহুডের তাহরির বিপ্লব ছিনতাইয়ের। মিসরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকড় গেড়েছিল ঐ সময়কার এ সকল অভিযোগে। পার্লামেন্ট নির্বাচন হলো, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলো। মোবারকের তল্পিবাহক রাজনৈতিক সহচর সামরিক ও বিচারিক এলিটরা তখন স্তম্ভিত, দ্বিধান্বিত, হতাশাক্লিষ্ট । তাদের সূক্ষ্ম-তীক্ষ্ন বুদ্ধিমত্তায় প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করা হলো পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান স্থগিত করতে। কেমন নিঃসঙ্গ, নিস্তরঙ্গ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির সেই গণতান্ত্রিক যাত্রা! মিসরের আভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ব্যক্তি- প্রতিষ্ঠানাদি, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী—এদের কেউই সেই অসহায়, নিঃসঙ্গ মুরসির পেছনে এসে দাঁড়ায়নি। তাকে হাঁটতে হয়েছে একাকী রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ব্রাদারহুডের তরুণ অনভিজ্ঞ কর্মী বাহিনী নিয়ে। কল্পনা করুন, নিজেকে মুরসির জায়গায় বসান, দেখুন, মাথায় ওপর রয়েছে সামরিক বাহিনীর অনিশ্চিত ছায়া। দুহাত-দুপায়ে রয়েছে বিচারিক অভিজাতবর্গের কোষবদ্ধ তরবারি, ডানে-বামে-সামনে-পেছনে গণতান্ত্রিক মুখোশে ঢাকা বিশ্বাসঘাতক স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী। কি করবেন আপনি? কি করতে পারতেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসি? দীর্ঘ কারান্তরালের গভীর অন্ধকারে থেকে মিসরের জনগণের স্বপ্ন পূরণে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে মুরসিকে, ব্রাদারহুডকে, তার কর্মী বাহিনীকে। কিন্তু কে, কারা, কোন গণতন্ত্রের বন্ধুরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে মুরসির প্রতি? ব্রাদারহুডের প্রতি? গণতান্ত্রিক যাত্রার দোরগোড়ায় মিসরের প্রতি? মিসরের রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মোবারক শাহীর উচ্ছিষ্টভোগী সাবেক ধান্ধাবাজ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রের নতুন মোড়কে আচ্ছাদিত হয়ে মিসরকে যে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তা ফেরাউন-মুসার অনির্বাণ সংগ্রামের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই গণতান্ত্রিক বিকাশের প্রথম দাবি ছিল পার্লামেন্ট শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগকে পরিচ্ছন্ন করা, সামরিক বাহিনীকে দেশপ্রেমের বেদীতে সমর্পিত করা, অর্থনীতি বেগবান করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা। গণতান্ত্রিক অর্জনের এ লক্ষ্যগুলো পূর্ণ করতে কত সময়ের দরকার? কত যুগের দরকার? কত শতাব্দীর দরকার? সময় নিরূপণে মুরসি বিরোধীরা তা কখনো ভেবেছেন কি? মুরসির শাসনকালের মাত্র এক বছরে কি এ লক্ষ্যগুলোর সর্বশেষ ধাপসমূহ অর্জন সম্ভব? প্রবল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতার মুখেও প্রেসিডেন্ট মুরসি আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। মিসরের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল সংবিধানের, তারও সমাধান করা হয়েছে। সংবিধানে মুরসিপ্রণীত ধারা-উপধারা অবিনশ্বর নয়, চিরন্তন নয়। যেকোন সময় তা সংশোধন-পরিমার্জন করা সম্ভব। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রীরা সেই সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে অভিযোগ তুললেন মিসরকে ইসলামীকরণের। মিসরকে ইসলামীকরণ বা সেই সংবিধানের ধারা-উপধারা নিয়ে যুক্তিতর্ক-বিতর্ক সৃষ্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। এসব ইস্যুতে বিতর্ক থাকবে, আলোচনা-সমালোচনা থাকবে, সংশোধনী থাকবে—এটাই তো গণতন্ত্রের সংস্কৃতি। কিন্তু তথাকথিত গণতন্ত্রী-সেক্যুলার-উদারবাদিগণ দাবি করলেন সংবিধান বাতিলের। কিন্তু তারা বললেন না ঐ সংবিধানের কোন কোন ধারা মিসরের আপামর জনগণের সংস্কৃতি বিরোধী, স্বার্থবিরোধী। কেবল ইসলাম বিদ্বেষের নোংরামিতে এত বেশি কলংকিত হলেন যে, সেই সংবিধানকে বাতিল এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে ৩০ জুনের সম্মেলন থেকে ১ জুলাই বিকাল ৫টা পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়া হলো। গণতন্ত্রের কত ঢং কত রং। অবিসংবাদিত তৃণমূলের জনগণের হূদয়মণি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উচ্ছেদের আল্টিমেটাম দেয়া হলো শহুরে বৃন্তচ্যুত, শেকড়চ্যুত, পথভ্রষ্ট রাজনৈতিক ধান্দাবাজদের স্পর্ধিত কণ্ঠে। কারা আছেন ৩০ জুনের তাহরিক বিদ্রোহে? শহুরে পুরুষ, উদারবাদী (liberal) সেক্যুলার সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়। একটি অপ্রসিদ্ধ অপরিচিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিজেদের বিদ্রোহী (তামারুদ) বলে পরিচিত করে দাবি করলেন প্রায় সোয়া দুই কোটি মিসরীয় মুরসির পদত্যাগের দাবিতে স্বাক্ষরদান করেছে। গণতন্ত্রের কি অদ্ভুত ভাওতাবাজি। তারা তলিয়ে দেখলেন না। বছরের পর বছর ধরে তিল তিল নির্যাতন জুলমে পিষ্ট হয়ে যে ব্রাদারহুড আরববিশ্বসহ সকল মুসলিম এবং অমুসলিম বিশ্বে কোটি সমর্থনের যে বৈশ্বিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে সেই ব্রাদারহুডের আপন ভূমি মিসরে তাদের ঘাঁটি কত শক্ত, কত কঠিন হতে পারে! গত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে মিসরের যে উচ্ছ্বসিত প্রান্তিক জনগণ পাগলের মত ব্রাদারহুডকে ভোট দিয়েছেন, সেই তৃণমূল জনউচ্ছ্বাস কি শহুরে কায়েমি স্বার্থবাদীদের ফুত্কারে এমনিতেই উবে যাবে? আজ যারা তাহরির স্কোয়ার এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বিদ্রোহ করছেন তাদের নেতৃবৃন্দের সিংহভাগই তো মোবারকের স্বৈরশাসন এবং বৈশ্বিক স্বৈরশাসনের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন। এল বারাদির মত পাশ্চাত্যের আজ্ঞাবহ মিসরীয় উদারবাদী মুরসির সাথে নির্বাচনে জনপ্রত্যাখ্যাত, পরাজিত হামদিদ সাব্বাহীর মত সেক্যুলারবাদীদের অতীত কার্যকলাপ বর্তমানের গণতান্ত্রিক ভণ্ড-মুখোশে যে কখনো আবৃত করা যাবে না সময়ই তা বলে দেবে। কেমন মিসর দেখতে চান মুরসির কাছে, তা বলছেন। কিন্তু কেমন মিসরের উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত হয়েছেন মুরসি, তা ভাবতে কৃপণতা কেন? দেশতো নয় একটা ধ্বংসস্তূপ পেয়েছেন মুরসি, যার কোষাগার শূন্য। সেই ভগ্ন অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের দ্বারস্থ হতে হয় নতুন প্রেসিডেন্টকে। ১৯৭৯ সালের সামরিক চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাহায্য অব্যাহত থাকলেও মিসরে তার বেসামরিক সাহায্য একাধিকবার হ্রাস করা হয়েছে। মিসরের বৈদেশিক ঋণ গত এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সালের জুন মাসে ৪২ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়েছে। মুরসির শাসনের প্রথম ৬ মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সর্বসাকুল্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯১ বিলিয়ন ডলারে। জাতীয় অর্থনীতির ন্যায় ভয়ংকর জাতীয় নিরাপত্তাও মুরসির উত্তরাধিকার সম্পদ। মিসরের সর্বত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির দোকানের পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের দোকান গড়ে উঠেছে। অনেকটা দৃশ্যমান গোপনীয়তা রক্ষা করেই বিভিন্ন রকমের অস্ত্রশস্ত্র যেমন, পিস্তল, চাকু, ছুরি, ক্ষুদ্রাস্ত্র, সুইচব্লেড, শর্টগান ইত্যাদি দেদারছে ক্রয়-বিক্রয় চলছে। ফলে খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ অবস্থা পরিবর্তনে যে মনোজাগতিক প্রস্তুতি দরকার, যে সামাজিক মূল্যবোধের পরিকাঠামো দরকার তার জন্য কি মিসরীয়দের অপেক্ষা করতে হবে না? তাহরীরের দ্বিতীয় বিপ্লবের প্লট রচিত ও দ্রোহ উদগীরিত হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি ও ভয়ংকর নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রচার চালিয়ে। শতবর্ষের বৈশ্বিক ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, অভ্যন্তরীণ স্বৈরতান্ত্রিক নিষ্পেষণে জর্জরিত মিসরের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য ও শৃংখলা ও পরিশীলিত সামাজিক মূল্যবোধ সময়ের দাবি। বিরোধী দল, গোষ্ঠী, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য কোনভাবে অবমূল্যায়ন না করে মুরসি ও ব্রাদারহুডের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো বিরোধী শিবিরের সকল কর্মতত্পরতাকে গঠনমূলক সমালোচনা হিসেবে পরিগণিত করা। যে কোন বিরোধিতা যেন ব্রাদারহুডকে কৌশলগত উত্কর্ষতা ও পারংগমতা (stratigic effiency) বৃদ্ধিতে অনুপ্রেরণা যোগায়, এমন মনোকাঠামো গড়ে তুলতে হবে প্রতিটি ব্রাদারহুড কর্মীকে। বিরোধী দল তাদের উন্নয়ন সহযোগী, দেশগড়ার অকৃত্রিম অংশীদার এ সত্য যেন ব্রাদারহুড ও মুরসি কখনো বিস্মৃত না হয়। জেম্স জোগবাঈ (james zogby) প্রতিষ্ঠিত আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউট সম্প্রতি “কার্নেগী এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস”-এর রিপোর্টের ভিত্তিতে এক পরিসংখ্যানে উদ্ধৃত করেছে যে, মুরসির প্রতি পূর্বের শতকরা ৭০ ভাগ জনসমর্থন হ্রাস পেয়ে বর্তমানে তা ২৮ ভাগে নেমে এসেছে। ব্রাদারহুডকে এ রিপোর্টের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে, নিষ্ঠুরভাবে আত্মসমালোচনা করতে হবে, কঠিনভাবে আত্মশাসন করতে হবে। মুরসি বিরোধীদেরকেও হটকারী, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে পরিশীলিত রাজনৈতিক নীতিতে পরিচালিত করতে হবে। তাদের রাজনৈতিক বিরোধিতার ভিত্তি হতে হবে মিসরের জনগণের স্বার্থরক্ষা, কোনভাবেই তা মতাদর্শের স্বার্থরক্ষার নিচুতায় যেন নেমে না আসে। এল বারাদি, হামীদ সাব্বাহীর মত আধুনিক শিক্ষিত প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য বিচ্যুত হলে কেবল মিসর নয় সমগ্র আরব জগতের নব-উত্থিত গণতান্ত্রিক বিকাশে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, জাতীয় খণ্ডতা দূর করে, গোষ্ঠী বিভাজন ত্যাগ করে মিসরকে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের পথেই হাঁটতে হবে। গণতান্ত্রিক মহাযাত্রার দ্বারপ্রান্তে তারা। প্রথমে আঁকতে হবে প্রথম পদক্ষেপ, এরপর দ্বিতীয়। এভাবে হাঁটি হাঁটি করে সন্তর্পণে সতর্কতা সহকারে পিচ্ছিল গণতান্ত্রিক পথে হাঁটতে হবে সকল মিসরীয়কে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ গণতান্ত্রিক বিশ্বের কণ্ঠে তাল মিলিয়ে আমরাও আশাবাদী যে মিসরীয়রা সর্বোচ্চ সংযম, স্থিরতা ও ধৈর্য সহকারে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক বিরোধ নিরসন করতে একাগ্র হবে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ল্যাং মেরে ফেলে দিলে নতুন সংকট ঘনীভূত হবে। বরং তাঁর ভুলগুলো শুধরানোর সুযোগ দিয়ে তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করা প্রয়োজন, সেজন্য তার মেয়াদের বাকি সময়ে তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতাদান গণতন্ত্রেরই দাবি। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র আল্ আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানতাপস ও ধর্মগুরুগণ বিভাজন থেকে দূরে থেকে গণতন্ত্রের স্বার্থে গৃহযুদ্ধের আশংকা দূর করার উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। তাদের ভাষায় লুটেরা, বাটপাড়, ডাকু, তস্কর, ভাড়াটে গুণ্ডাদের দ্বারা মিসরে অরাজকতা সৃষ্টি সকল দূরভিসন্ধির সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে তারা সকলকে সতর্ক করেছেন। সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মিসরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আব্দুল ফাত্তাহ আল শিশীর নিবিড় বৈঠক, প্রেসিডেন্ট মুরসির সাথে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বৈঠকসহ খুবই স্পর্শকাতর জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আশংকা সৃষ্টি হচ্ছে সর্বমহলে। সকল অস্থিরতা দূর হতে পারে কেবল মিসরের গণতান্ত্রিক নক্ষত্রপতন রোধ প্রকল্পে, এ দায়িত্ব সকল মিসরীয়ের। এ দায়িত্ব মুরসির, মুরসি বিরোধীদের, সকলের। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় mramin68@yahoo.com