পাহাড়ি জনপদের কাব্য

ঢাকা আর্ট সেন্টার আয়োজিত মুসরাত রিয়াজীর একক প্রদর্শনী আকাশের বিপরীতে পাহাড়ের সবুজ স্পষ্ট দেখায়। আলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, সবুজ, মানুষ সবই শিল্পীর কাছে গ্রহণীয়। রিয়াজী বাংলাদেশের পাহাড়ি তিন জনপদের (বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি) জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান, পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ছবি আঁকেন। মুসরাতের কাজের মাধ্যম—ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক। ৩০টি কাজের মাঝে নির্দিষ্ট করে কিছু কাজে আলাদা করে রংয়ের শুশ্রূষার ছাপ বোঝা যায়। বিষয়ের সূক্ষ্ম উপস্থাপনে কাজগুলোতে ভারতীয় মিনিয়েচার রীতির সন্ধান দেয়। ছবির বিষয়ের মাঝে চাকমা বর্ণমালার ব্যবহার চিত্রতলের মৌলিকত্ব হারিয়েছে। যদিও এটিকে মুসরাত ওই ছবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছেন। ছবির বিষয়ে কল্পনার মিশ্রণ নেই। আছে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ধারাবাহিক আচরণ। একথা একেবারে সত্য, এ জনপদের (তিন পার্বত্য জেলায়) সভ্যতা, কৃষ্টি, আর সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে লালন করছেন ওই জনপদের মানুষ। প্রযুক্তি, বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতি, সম্ভাবনাকে তারা গ্রহণ করেন তাদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির মধ্যে বসবাস করেই। মুসরাত পাহাড়ে বসবাস করেন। তিনি ওই অঞ্চলের বাইরে থেকে এসে একসময় পাহাড়ের মানুষের সাথে জীবনযুক্ত করেন। একেবারে কাছ থেকে দেখা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো তাঁর ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে নারী-পুরুষের দেহের আচ্ছাদন আমাদের কাছে ব্যতিক্রম দেখা যায়। দেহাবয়বের পেশি ও অভিব্যক্তিতে ক্ষিপ্র, লড়াকু ছাপ মুসরাতের কাজে স্পষ্ট। খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, পোশাক, ধর্মপালন—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ছবিতে উপস্থাপন করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পী ওই অঞ্চলে বসবাস করার কারণে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। চাকমা ভাষার ব্যবহার এ প্রদর্শনীর কাজগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলার পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-জাতির বর্ণ বা ভাষাকে শিল্পী স্থান করে দিতে চান। ঐতিহ্যনির্ভর জীবনযাপন প্রণালীকে আধুনিকতা যেভাবে গ্রাস করছে তা একসময় হারিয়ে যাবে। এ পরিবর্তন আমাদের জন্যে তৈরি করে দেবে ঐতিহ্যশূন্যতা। বিষয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি মুসরাতের ছবির রংয়ের কথা বিশেষ আলোচ্য। ছবিতে রংয়ের রঞ্জনগত আভা কল্পনাকে সমৃদ্ধ করে এবং বাস্তবতাকে শিল্পী যতবেশি রং নিয়ে কল্পনা করেন, ততবেশি বাস্তব অবস্থাকে নতুন করে আবিষ্কারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। রংয়ে গতি নির্ণীত হয় আলো থেকে অন্ধকারে আর অন্ধকার থেকে আলোয়। রংয়ের ব্যবহারের ওপরই চিত্রনির্মাণের মৌলিক আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসরাতের ক্যানভাস একরঙা। একেকটি ক্যানভাস একেক রং ধারণ করেছে। সেপিয়া গ্রিনের ক্যানভাসের ভেতর মানুষের অবয়বও এঁকেছেন একই রংয়ে। কাছে ও দূরের বিষয়েও নির্ণয় করেন একটি রংয়ে। মুসরাতের ফিগার আঁকার প্রতি দখল থেকে তৈরি হয়ে যায় কাজের শক্তি। ক্যানভাস হয়ে ওঠে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মুরং শিরোনামের কাজে ছবির জমিনে ব্যবহার করেন দুটি রং। চৌকোনো, বর্গাকৃতি রংয়ের জমিনে মানুষের দেহাবয়বই প্রধান। ঠাসা মানুষের নানা ভঙ্গিতে ক্যানভাসে গতি তৈরি করে দেয়। সুঠাম পেশির মানব-মানবীর ক্ষিপ্রতা কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। নান্দনিকরূপ নির্মাণের সাথে জ্যামিতিক আকৃতি প্রয়োগের বিভাজনও লক্ষণীয়। ছবির পরিপ্রেক্ষিতের সাথে উল্লম্ব ও আড়াআড়ি আকৃতিতে ব্যবহার করেছেন গাঢ় রং। রেখার স্পষ্ট দ্রুত চলনের জন্যে বিষয়ে ছন্দ তৈরি হয়েছে। চাকমা ভাষায় রাধামন ও ধনপতি জনপ্রিয় মিথ। ওই অঞ্চলের এ দুটি জনপ্রিয় পুরাণ নিয়ে ছবি এঁকেছেন রাধামন ও ধনপতি শিরোনামে। রাজপূণ্যাহ্য, নৃত্যরত চাকমা রমণী, নারী, শিশু, পেশিবহুল পুরুষ দেহের দুরন্ত ভঙ্গির জন্যে ছবিটি বিশেষ শক্তি অর্জন করেছে। সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা আর্ট সেন্টারে ২৮ জুন শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ১ জুলাই।