[ নি র্বা চ ন ]
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: জনগণ অভীপ্সা
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৩, ২১:০০
ক. রুশোর রাষ্ট্রতত্ত্বমূলক বিখ্যাত গ্রন্থ-Social contract বা ‘সামাজিক চুক্তি’ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে General will বা সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্ব। এ সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্ব দ্বারা রুশো এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কোন বিশেষ ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছা মূল নয়, বরং মূল হচ্ছে মানুষের সমষ্টিগত ইচ্ছা। ব্যষ্টি নিয়েই সমষ্টি। ব্যষ্টি যখন পৃথক পৃথকভাবে তাদের ইচ্ছাশক্তির সামষ্টিক প্রকাশ ঘটায় তা যৌথ সমাজসত্তা ধারণ করে। এটাই হচ্ছে ব্যক্তি সাধারণের ইচ্ছার সাধারণতত্ত্ব। জেনারেল বা সাধারণ এই অর্থে যে, রাষ্ট্রে বসবাসরত গরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছাই এক ও অভিন্ন। ‘ব্যক্তির ইচ্ছার ভিত্তিতে সমাজ বা রাষ্ট্রের ইচ্ছা’-এই তত্ত্বের কারণেই রুশোকে ‘জনগণের সার্বভৌমত্বের’ প্রবক্তা বলা হয়। জনগণের সাধারণ ইচ্ছাতত্ত্বের সাথে মাঝে মধ্যেই ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ বা সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তির ইচ্ছাকে বলা হয় পার্টিকুলার উইল বা ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি। ব্যক্তি যখন সচেতন বা অচেতনভাবে যৌথের স্বার্থ বিরোধী কাজে লিপ্ত হয় তখনই সামাজিক বা রাজনৈতিক সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
খ. এ তাত্ত্বিক ভূমিকার উদ্দেশ্য হল বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণ ইচ্ছা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গণগভীরতা প্রমাণ করা। সাধারণ যখন কোন বিষয়কে গভীর ব্যাপক এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ধারণ করে তখন তাকে ইচ্ছার চেয়ে অভীপ্সা বলাই ভাল। অভীপ্সা মানেই ইচ্ছার প্রবল রূপ। সাধারণভাবে আমরা যাকে গণদাবি বলে থাকি। গোটা দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে যে ধরনের জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে এর বিপরীতে কথিত পার্টিকুলার উইল বা ব্যক্তির ইচ্ছার দ্বন্দ্ব এই সময়ে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এক রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে।
গ. নীতিগতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অনেক পুরনো। প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার যখন থেকে সূচনা হয় তখন থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম। যখন নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তন হয় তখন একটি সরকার থেকে অপর সরকারে পরিবর্তনের সময়টিকে অতীতে সবসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামে না হলেও কার্যত: সরকার ছিল অনানুষ্ঠানিক মধ্যবর্তী এবং নিরপেক্ষ সরকার। এ মধ্যবর্তী সময়ে সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক সম্পাদন করতো। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখনও পাশ্চাত্যে এবং প্রাচ্যে বিশ্বস্ততার সাথে অনুসৃত হচ্ছে।
ঘ. বাংলাদেশে পাশ্চাত্যের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভুলত্রুটির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। ১৯৯১ সালে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংসদীয় ব্যবস্থা পুন:প্রবর্তিত হয়। সূক্ষ্ম কারচুপি আবিষ্কার করে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা সংসদীয় গণতন্ত্রের চিরায়ত ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ধারাবাহিকতা অস্বীকার করে তাদের আজকের রাজনৈতিক শত্রুদের নিয়ে যৌথ আন্দোলনের সূচনা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সে সময়ে জাতীয়তাবাদী সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। প্রবর্তিত ব্যবস্থাধীনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। পরপর তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করে। কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে জনমত পরিলক্ষিত হয়নি।
ঙ. ক্ষমতাকে চিরস্থায়ীভাবে করায়ত্ত করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবক্তা তারাই এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়। সমস্ত সংসদীয় রীতিনীতি লংঘন করে, ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে, রীতি রেওয়াজকে অগ্রাহ্য করে তারা তাদের পুরনো বাকশালী ষড়যন্ত্রে ফিরে যায়। সংবিধানের ১৫ দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সমগ্র জাতির মতামতকে অগ্রাহ্য করে ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে। সুপ্রিম কোর্টের রায় সর্বসম্মত ছিল না। তদুপরি প্রাথমিক রায়ে আরো দুবারের জন্য সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়। সংবিধান সংশোধন কমিটি, গৃহীত এমিকিউরাসদের মতামত, ক্ষমতাসীনদের বাম অংশসহ সকল রাজনৈতিক দলের মতামত, চ্যানেলগুলোর টকশোতে প্রকাশিত মতামত এবং সংবাদপত্রে জনমত জরিপ সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে অর্থাত্ সাধারণ ইচ্ছা বা জেনারেল উইলকে উপেক্ষা করে পার্টিকুলার উইল বা ব্যক্তিইচ্ছা প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি পত্রিকায় দেখা গেছে ৯০% মানুষ তত্ত্বাবধায়ক চায়। এ প্রতিষ্ঠিত সত্যকে ব্যক্তি উপহাস করেন, অগ্রাহ্য করেন।
চ. স্পষ্টত:ই সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব আর ব্যক্তিইচ্ছার প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অবশেষে প্রতিহিংসা গোটা জাতিকে গ্রাস করে। গোটা গণমাধ্যম, সংসদীয় বিরোধী দল, সংসদের বাইরে সকল প্রকার প্রেসার গ্রুপ, সিভিল সোসাইটি, ট্রেড ইউনিয়ন তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে। ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরে নীরব বিরোধিতা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তির ইচ্ছায় আত্মসমর্পিত হয় সবাই। এই ইগো বা জেদকে বিশ্লেষকরা সবাই ইতোমধ্যে শুধু ব্যক্তিতন্ত্র নয় বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। গণতন্ত্র বা গণতন্ত্রায়নের ধারণার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায়ের ষড়যন্ত্র করেছেন বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা। ইতিপূর্বে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রকে তিনি স্বৈরতন্ত্রে নিপতিত করেছেন। প্রতিবাদের কোন ভাষাই এখন আর গৃহীত নয়। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পরিত্যক্ত, ধর্মীয় স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত। এমনকি পোস্টার লাগানো অপরাধ, মানব বন্ধনের মত ন্যূনতম রাজনৈতিক কর্মসূচিও বিধি বহির্ভূত। বিগত প্রায় পাঁচ বছরে কয়েকশ’ লোককে হত্যা করা হয়েছে। শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে অনেককে। লক্ষ লক্ষ মানুষের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। হামলা নিপীড়ন নির্যাতন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে অগ্রাহ্য করার জন্য হেন উপায় নেই যা প্রয়োগ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে ধস, পদ্মা সেতুর বিশ্ব আলোচিত দুর্নীতি, ড. ইউনূস তথা গ্রামীণ ব্যাংকে লণ্ডভণ্ড করণের প্রতিহিংসা, ছাত্রলীগের সন্ত্রাস টেন্ডারবাজিতে বিশ্বরেকর্ড, বিরোধী দলের সর্বাত্মক দমনপীড়ন, স্বাধীনতা বিরোধী বিতাড়নের নামে প্রতিপক্ষ দলন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে শিশু যুব প্রবীণ যে কাউকে সরাসরি গুলিবর্ষণ, মন্ত্রী-এমপিদের ব্যাপক লুটপাট, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের মত হাজারো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকার যখন ভয়ানক জনরোষের সম্মুখীন তখন তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যমে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মাধ্যমে যে নীরব জনবিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে তা তাদেরকে অত্যধিক বিচলিত করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগজনক উক্তি, মন্ত্রীদের প্রলাপ এবং নেতা পাতি নেতাদের আবোল-তাবোল বক্তব্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
ছ. ক্ষমতাসীনরা প্রতিফলিত জনরোষ থেকে রক্ষার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজছেন—
১. প্রায়শই তারা ১/১১ এর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এটা আসলে আশঙ্কা নয়। তাদের আশা। নিজেরাই অসম্ভব অরাজকতা সৃষ্টি করে ১/১১ এর আমদানি করার পাঁয়তারা কষছেন।
২. নিজেদের বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে জাতীয় সরকারের ধুয়া তুলে শেষ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
৩. জরুরি অবস্থা অথবা যুদ্ধাবস্থার মত পরিবেশ সৃষ্টি করে আপাতত: হলেও ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
৪. তথাকথিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোর আড়ালে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
৫. কোন বিকল্পই হয়তো কাজে আসবে না। জনমতের চাপে অবশেষে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য হবেন। অবশ্য যদি বিরোধী শক্তি আন্দোলনকে অনিবার্য করে তুলতে পারে।
জ. রাজনীতি বিশ্লেষণে এলমন্ডের কাঠামো কার্যগত তত্ত্ব (Structural Functional Approach) একটি আধুনিক মডেল। এ মডেলকে ইনপুট(Input) এবং আউটপুট (Output) এ দু কার্যাবলীর ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়। ইনপুট কার্যাবলী অনুযায়ী জনগণ তাদের দাবিসমূহ সরকার বা কর্তৃপক্ষ সমীপে উপস্থাপন করে। যেমন মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠালে বক্স ভর্তি হয়ে যায়। তা গ্রহণ না করলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। যথার্থ সরকার উত্থিত দাবিসমূহ বিবেচনাপূর্বক কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ মডেল অনুযায়ী যদি আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আন্দোলন বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে ইনপুট অর্থাত্ জনসাধারণের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবি একটি অপরিহার্য বা সর্বাধিক কাম্য অবস্থায় রয়েছে। এখন সরকারের উচিত রাজনৈতিক যোগাযোগ (Political Communication) এর মাধ্যমে উত্থিত দাবির মীমাংসা করা। এক্ষেত্রে বিধি প্রণয়ন (Rule Making), বিধি বাস্তবায়ন (Rule Application) হচ্ছে সরকারের পরবর্তী কাজ। কিন্তু সরকারের কোন তত্পরতাই যদি সম্পাদিত না হয় তাহলে সরকার কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জনসাধারণের তরফ থেকে এরিস্টটলীয় সূত্র মোতাবেক বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।
ঝ. শক্তি প্রয়োগ কৌশলের উপর নির্ভর করে সরকার যদি সম্মতি বা সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না করে তাহলে ব্যাকরণ বহির্ভূত যে কোন অঘটন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেহেতু জনগণ অভীপ্সায় পরিণত হয়েছে এবং সময় এ দাবিকে অতি উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে সুতরাং এর বাস্তবায়ন অনিবার্য এবং অতিসন্নিকট। ভিক্টর হুগোর ভাষায়-‘No power on the earth can stop an idea where time has come’
লেখক : প্রফেসর,সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।