প্রচার শেষ, ভোটের অপেক্ষা

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতেই শেষ হয়ে গেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারা গাজীপুর ছেড়ে গেছেন। নির্বাচনী এলাকা এখন আপাত শান্ত। গত কয়দিনের উন্মাতাল উত্তেজনার ছিটেফোঁটা নেই কোথাও। কিন্তু চাপা নির্বাচনী উত্তাপ অনুভব করছেন সবাই। প্রার্থীদের প্রচারণা কার্যক্রম চলছে। তবে তা সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে না। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সবাই ব্যস্ত নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে। সবাই অপেক্ষা করছেন ভোটযুদ্ধের। সেই ভোটযুদ্ধ হবে আগামীকাল শনিবার। প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, তাই গাজীপুরবাসীর মাঝে তুমুল উত্তেজনা। সেই উত্তেজনায় জাতীয় রাজনৈতিক বাতাবরণ পাওয়ায় সারাদেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন গাজীপুর। গাজীপুরবাসী আগামীকাল শনিবার সকাল থেকে সিটি কর্পোরেশনের ৩৯২টি কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেন প্রথম নগরপিতা নির্বাচন করতে। কে হচ্ছেন প্রথম নগর পিতা -এ নিয়ে গাজীপুরবাসীর মাঝে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। ১৪ দল সমর্থিত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র এ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান (দোয়াত কলম) নাকি ১৮ দল ও গাজীপুর মহানগর সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক এম.এ মান্নান (টেলিভিশন)। এ প্রশ্নই এখন নগরবাসীর মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোট যুদ্ধের কঠিন পরীক্ষায় আজমত উল্লা খান কখনো পরাজিত হননি। অপরদিকে অধ্যাপক মান্নান ১৯৯১ সালের পর কোন নির্বাচনেই সফল হতে পারেননি। ভোটাররা জোট ও মহাজোটের এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মাঝে কাকে বেছে নেবেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও হিসাব-নিকেশ সমীকরণের ঝড় শুরু হয়েছে। এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের জেলা আহবায়ক মেজবাহ উদ্দিন সরকার রুবেল (হাঁস), স্বতন্ত্র প্রার্থী আমান উল্লাহ (তালা) ও রিনা সুলতানা (প্রজাপতি) ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে মেয়র নির্বাচনে মূল লড়াইটা যে হবে আজমত উল্লা খান ও এম এ মান্নানের মধ্যে তা পরিষ্কার। নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দুই জোটের আলোচিত দুই প্রার্থী। নির্বাচনের পরিবেশ ও জয়-পরাজয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তারা। আজমত উল্লা খান শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে, এম.এ মান্নান অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন। আজমত উল্লাহ খান বলেন, মানুষের প্রতি আমার আহবান আপনারা ভোট কেন্দ্রে যাবেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবেন। কোন ভয় নেই। গাজীপুরে সন্ত্রাসীদের কোন স্থান নেই। আমি সব সময় গাজীপুরের মানুষের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকবো। মানুষের ভালোবাসা আমার প্রথম পুিঁজ। আমি গাজীপুরকে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন গড়ে তুলবো, যাতায়াতের জন্য রাস্তার পাশে বাতি জ্বালানোর জন্য ব্যবস্থা করা হবে। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। কারণ নির্বাচনের মাঠ ও জনগণ আমাদের পক্ষে রয়েছে। ইনশাআল্লাহ সুষ্ঠু পরিবেশের নির্বাচনে আমি বিজয়ী হবো। অপরদিকে, এমএ মান্নান বলেন, সরকার আমার বিজয় ছিনিয়ে নেবার জন্য আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করছে। আমার বিরুদ্ধে হজ্বের টাকা আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ, কর ফাঁকিসহ নানা অপপ্রচার করছে। আমি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছি। নির্বাচিত হলে গাজীপুরকে দেশের সেরা সিটি কর্পোরেশন হিসাবে গড়ে তুলব। শ্রমিকদের জন্য স্বল্প খরচে থাকার, তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করব। কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করব। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো। কেমন নগরপিতা চাই জানতে চাইলে অনেক ভোটার বলেন, নব গঠিত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রথম মেয়র হিসাবে আমরা তাকে চাই যিনি আগামী দিনে নগরীর উন্নয়নমূলক কাজে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারবেন, যিনি থাকবেন এলাকার উন্নয়নে নিবেদিত। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ভূমিকা পালন করেন। হাসান আল মাহমুদ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন বাসিন্দা বলেন, এমন একজনকে ভোট দেব যিনি সব সময় নগরবাসীর পাশে থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আবু হানিফ বলেন, যে নগরীর উন্নয়ন নিয়ে ভাববেন এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন তাকেই ভোট দেব। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ : নির্বাচন আর মাত্র একদিন বাকি থাকলেও ভোট কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে কিছু কিছু ভোটার সংশয় প্রকাশ করেছেন। ভোটাররা বলছেন, ভোটের পরিবেশ ভালো থাকলে তারা ভোট কেন্দ্রে যাবেন। আজমত উল্লাহ খান এবং এম এ মান্নান একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন। উভয় প্রার্থী নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। শেষ দিনে বিরামহীন প্রচারণা : নবগঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। শেষ মুহূর্তে বড় দুই জোট সমর্থিত দুই প্রার্থী নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্রচারণা, গণসংযোগ ও পথসভায় ব্যস্ত ছিলেন। আজ আনুষ্ঠানিক কোন প্রচারণা না থাকায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থক নেতাকর্মীরা এখন ভোটের হিসাব কষছেন। বিভিন্ন কেন্দ্রের এজেন্ট নিয়োগ, পরিচয়পত্র প্রদান, কেন্দ্রের জন্য পোস্টার-লিফলেট বিতরণসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকবেন আজ। গতকাল আজমত উল্লাহ খান স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে টঙ্গী এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে, এম.এ মান্নান স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে গতকাল কোণাবাড়ী-কাশিমপুর, কাউলতিয়া এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় গণসংযোগ করেন ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। বিএনপির সংবাদ সম্মেলন :বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী ব্রিগেঃ জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ গতকাল চান্দনা চৌরাস্তায় নির্বাচনী কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সরকারের উচ্চ মহল থেকে নির্বাচন প্রভাবিত করতে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি করা হলে জনগণকে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।