মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে সাত ভাগের উপরে

ব্যাপক মুদ্রার ব্যবহার বেড়েছে

হাই পাওয়ার মানির ব্যবহার বাড়ার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, এর কারণে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির একটি চাপ থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করায় তা মূল্যস্ফীতি কমায় প্রভাব রাখছে, তবে একই সাথে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে  সাম্প্রতিক সময় দেশে ব্রড মানি বা ব্যাপক মুদ্রার (এম১ এবং টাইম ডেপোজিট) ব্যবহার বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের প্রবণতায় ব্রড মানির ব্যবহার বেড়ে যায়। এতে মূল্যস্ফীতির হার কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭-এর নিচে নামানো যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির হার ৭-এর নিচে নামতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে মুদ্রা সঙ্কোচন করেছে সে হারে মূল্যস্ফীতি কমেনি। কিন্তু সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে ঠিকই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির হার বেশি হলেই জনগণের জন্য তা খারাপ নয় যদি সে হারে তাদের আয়ও বাড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সে হারে জনগণের আয় বাড়েনি। এজন্যই অনেকে কষ্টে পড়ে গেছেন। তাছাড়া প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কে থাকার পর এখনো এ হার সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে থাকা জনগণের জন্য সত্যিই কষ্টকর। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে টাকার সরবরাহ কমানোর চেষ্টা করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা তুলনামূলকভাবে কাঙ্ক্ষিত হারে কমেনি। অর্থনীতিবিদরা এর কারণ হিসেবে হাই পাওয়ার মানির অতিরিক্ত ব্যবহারকে দায়ী করছেন। হাই পাওয়ার মানির ব্যবহার বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বেশি পড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এসব প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, সরকারের খরচ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ করায় মানি মাল্টিপ্লায়ার বেড়ে গেছে। ফলে রিজার্ভের বিপরীতে ঋণ বা হাই পাওয়ার মানি সরকার বেশি ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, সরকার প্রতি বছরই বলছে ব্যাংক থেকে কম ঋণ করবে কিন্তু বছর শেষে দেখা যাচ্ছে সরকার অনেক বেশি ঋণ করছে। বিধায় হাই পাওয়ার মানির ব্যবহার বেড়ে গেছে। এ বছরও বিদেশি অর্থায়ন থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহার করার কথা রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব না হলে সরকারের ব্যাংক ঋণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়তে পারে। হাই পাওয়ার মানির ব্যবহার বাড়ার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, এর কারণে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির একটি চাপ থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করায় তা মূল্যস্ফীতি কমায় প্রভাব রাখছে, তবে একই সাথে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১২ অর্থ বছরে ব্যাপক মুদ্রা বা ব্রড মানির তুলনায় রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় ব্যাপক মুদ্রা গুণক বা মানি মাল্টিপ্লায়ার জুন ২০১১ শেষের ৪.৯০৯ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন ২০১২ শেষে ৫.২৮৭ এ দাঁড়ায়। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের মার্চ মাস শেষে ব্যাপক মুদ্রার বা ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি হওয়ায় জুন ২০১২-এর তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে মার্চ ২০১৩ শেষে মুদ্রা গুণক বা মানি মাল্টিপ্লায়ার ৫.৩৫৩ এ দাঁড়ায়। মার্চ ২০১৩ শেষে রিজার্ভ/আমানত অনুপাত জুন ২০১২ শেষের ০.০৮৬ থেকে হ্রাস পেয়ে মার্চ ২০১৩ শেষে ০.০৮২ এবং মুদ্রা/আমানত অনুপাত ০.১২৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ০.১২৯ এ দাঁড়ায়। মানি মাল্টিপ্লায়ার প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর বলেন, মানি মাল্টিপ্লায়ার বেড়ে যাওয়া কিছুটা নেতিবাচক। সাধারণত এ হার ৪-৫ এর মধ্যে থাকে। পরিবর্তনশীল তবে স্থিতিশীল। খুব বেশি পরিবর্তন হওয়া ইতিবাচক নয়। বাংলদেশে সাম্প্রতিক সময় আর্থিক খাতে কিছু অস্থিতিশীলতা ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে যে কারণে এ হার পরিবর্তন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময় আর্থিক খাতে দুর্নীতি ও জালিয়াতি এবং ডলারের আয়-ব্যয়ের হঠাত্ পরিবর্তনের কারণেই মুদ্রার গুণক বা মানি মাল্টিপ্লায়ার বেড়ে গেছে। এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্রড মানির পরিমাণ যদি তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায় তখন মানি মাল্টিপ্লায়ার বাড়ে। দায়-আমানত অনুপাত যদি বাড়ে অর্থাত্ আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের হার বাড়লে মানি মাল্টিপ্লায়ার বেড়ে যায়। এটা এভাবেও হতে পারে যে ঋণ দেয়া ও পরিশোধ খুব দ্রুত হচ্ছে। মানি মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বলেন, গতিশীল অর্থনীতিতে এ ধরনের অবস্থা দেখা দিতে পারে। তবে ঋণ যদি অনুত্পাদনশীল খাতে বেশি ঋণ দেয়া হয় তবে মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণে দুর্নীতি, জালিয়াতি বা সম্পদের মূল্যমান কমার আশঙ্কা দেখা দেয়। এছাড়া ব্যাংকগুলো কলমানি মার্কেট থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের ঋণ দিতে গিয়ে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা ও ঋণের সুদহার উচ্চ হয়ে পড়তে পারে। যেটি সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশে বিনিয়োগে বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এদিকে প্রায় দুই বছর সংযত মুদ্রানীতি গ্রহণ করার পর সর্বশেষ (জানুয়ারি-জুন) নেয়া মুদ্রানীতিতে পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এ মুদ্রানীতিতে বিশ্বমন্দার কারণে চাহিদা কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব মুখ্য নীতি সুদহার অর্থাত্ রেপো ও বিশেষ রেপো সুদহার দশমিক পাঁচ শতাংশ বা পঞ্চাশ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের ঊর্ধ্বসীমা আগেকার ১৮ শতাংশের বদলে সাড়ে ১৮ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়। ব্যাপক মুদ্রার যোগানে প্রবৃদ্ধিসীমা আগেকার সাড়ে ১৬ শতাংশ থেকে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে গত জুন নাগাদ অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ানোর বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ কিন্তু নতুন মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এদিকে ব্যাপক মুদ্রার যোগান বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২ সালের তথ্য অনুযায়ী এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে এ হার ৮.৮ শতাংশ, ভুটানে ৭.২ শতাংশ, চীনে ১৪.৪ শতাংশ, ভারতে ১১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৪ শতাংশ, জাপানে ২.২ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৮.৮ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ শতাংশ, নেপালে ১৪.৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৭.৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ১০.৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ১১.৯ শতাংশ। আর বাংলাদেশে এ হার ১৭ শতাংশের ওপরে। এ দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে দেশের ব্যাপক মুদ্রার যোগান কম সে দেশের মূল্যস্ফীতির হারও তুলনামূলকভাবে কম। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, আফগানিস্তানে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ। আর ভুটানে এ হার ১.৫ শতাংশ, চীনে ১.৮ শতাংশ, ভারতে ৮.২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৪.৫ শতাংশ, জাপানে (-) ০.৯ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ০.৮ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ শতাংশ, নেপালে ৮.৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৯.৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৮.৯ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ১.৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ১০.৮ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইনকাম ভেলোসিটি অব মানি ২০১০-১১ অর্থ বছর শেষের ১.৮১ থেকে ২.২১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২০১১-১২ অর্থ বছর শেষে ১.৭৭-এ দাঁড়িয়েছে। যা পূর্ববর্তী অর্থ বছরে ৫.২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। উল্লেখ্য যে, বিগত কয়েক বছর ধরে মুদ্রার আয়গতি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ২০০৭-০৮ অর্থ বছর শেষে মুদ্রার আয়গতি হ্রাস পায় ২.০৩ শতাংশ। ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০, ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ অর্থ বছরে মুদ্রার আয়গতি হ্রাস পেয়েছে যথাক্রমে ৫.৪৮, ৭.৭৩, ৫.২৪ এবং ২.২১ শতাংশ। বিগত কয়েক বছর ধরে মুদ্রার আয়গতির ক্রমহ্রাসমান ধারা অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মুদ্রায়ন বা মানিটাইজেশন নির্দেশ করে। ড. আহসান মনসুর বলেন, এটা কিছুটা ইতিবাচক। কারণ এর অর্থ হচ্ছে অল্প অর্থ দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ধীরে ধীরে মানিটাইজেড হতে থাকলে শ্রমিকরা টাকার চাহিদা বাড়ায়, ফলে টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। এ অবস্থারও পরিবর্তন হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, মানুষের আয় বাড়লে তারা নগদ টাকার পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ড বা এ ধরনের ব্রড মানি তৈরিতে উদ্যোগী হয়। ফলে এটা হতে পারে। কিংবা অর্থিক খাতের বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্ট তৈরির প্রবণতা থেকেও এ হার বাড়তে পারে।