নিভৃতে কাঁদে কত প্রাণ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২১:২৯
সাভারের রানা প্লাজার ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক বাণিজ্যের প্রসারতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার পথ থেকে সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টা প্রাথমিক অবস্থায় রক্ষা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্ধার তত্পরতা, আর্থিক সহায়তা, চিকিত্সা সহায়তাসহ অন্যান্য আশ্বাস ঘটনায় আহত ও নিহত পরিবারের সদস্যরা কিছুটা হলেও আশ্রয়ের সন্ধান পেয়েছে। রানা প্লাজার ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে তা হল, আমাদের দেশে সকল ক্ষেত্রের কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালিত হয় সৃষ্টিকর্তা ছাড়া উপলব্ধি করা কষ্টসাধ্য। শুধুমাত্র পোশাক শ্রমিক নয়, অন্যান্য পেশা/বৃত্তির লোকজন নিরাপত্তাহীনতা থেকে বেঁচে আছে।
সমপ্রতি দুর্যোগ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা “র্যাপিড লিড অ্যাসেসমেন্ট অন সারভাইভার্স অব সাভার বিল্ডিং কলাপস্” শিরোনামে যে জরিপ করেছে তাতে সাভার ট্র্যাজেডির শ্রমিকদের প্রকৃতি প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আহত শ্রমিকদের চিকিত্সা সেবা ও তাদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান, নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনিয়মের সুর বিভিন্নভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে। সাভার ট্র্যাজেডিতে আহত ব্যক্তিদের আয়ে ৭৬ শতাংশ পরিবার পরিচালিত হয়। এই সময় পরিবারের আয় বিপর্যয়ের সম্মুখীন যা পরিবারের শিশু, বৃদ্ধসহ অন্যান্য সদস্যকে অন্য এক জীবন দুর্যোগের সম্মুখীন করেছে। আহত শ্রমিকই শুধু শারীরিক ও মানসিকভাবে আহত হয়, তার এই ঘটনা পরিবারের সদস্যদের মানসিক রক্ত ঝড়িয়েছে, নিভৃতে কষ্ট সহ্য করার নিষ্ঠুর পরিবেশের যোগান দিয়েছে। যারা নিহত হয়েছে তাদের ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু যারা বেঁচে আছে তাদের অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা, মানসিক ট্রমা কিছুটা হলেও কমানোর প্রচেষ্টা সার্বিকভবে করা উচিত। পরিচালিত গবেষণায় লক্ষ্যণীয় যে, ২৮৮ জন শ্রমিক মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত; ৯৫২ জন শ্রমিক এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি কোন সহায়তার সাথে পরিচিত হতে পারেনি। যে সমস্ত ব্যক্তিদের অবহেলায় রানা প্লাজার ঘটনা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের অনুভূতিতে বাংলাদেশের পোশাক কর্মীদের অবহেলার খবর প্রকাশ পেয়েছে তা বিশ্ব অঙ্গনে এদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এ সমস্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দিয়ে রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছে, সেই সাথে তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেশাগত অপরাধের বিষয়টি সর্বমহলে অবগত হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত; মজুরি নির্ধারণে, নিরাপত্তায়, মালিক পক্ষ থেকে দৈনন্দিন আচরণে, ক্ষেত্র বিশেষে যৌন নির্যাতনের কথাও মাঝে মাঝে শোনা যায়। সাভার ঘটনা জাতির সামনে পোশাক শিল্পের মালিকদের রমরমা অবস্থা অন্যদিকে পোশাক শ্রমিকদের দুর্দশা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সমাজতাত্ত্বিক কাঠামো পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায়, জীবনমানের মানদণ্ডে পোশাক শ্রমিকরা নিম্নমানের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আবদ্ধ; পরিবর্তনের কঠোর প্রচেষ্টা তাদের রয়েছে কিন্তু কতিপয় শিল্প মালিকদের নৈতিক-অনৈতিক বুদ্ধির বেড়াজালে পোশাক শ্রমিকদের স্বাপ্নিক আদল বদল হচ্ছে। বিশ্বের শ্রমিক বিপ্লব ইতিহাস আমাদের সামনে যে বিষয়টি জানান দেয় তা হল বঞ্চিত, অবহেলিত শ্রমিক যখন বঞ্চনা সহ্যের সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করবে তখন শ্রেণী কিংবা সাম্যের বিপ্লব ঘটানোর মত প্রয়োজনীয় উপকরণের সহায়ক শক্তি নিজ জীবনের গণ্ডি থেকে লাভ করে।
সাভার ঘটনা জাতিকে বড় আকারে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের অবস্থা তুলে ধরেছে। কতিপয় পেশাগত অপরাধীর কারণে অত্যন্ত কষ্টধায়ক এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সত্যিকার অর্থে পোশাক শিল্পের ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে খুব কম ভবনই সঠিক নিয়মানুসারে তৈরি হয়েছে। এভাবে অনিয়ম করে ভবন তৈরির মাধ্যমে মানুষকে মারার ‘সুইসাইড ভবন স্কোয়াড’ তৈরি থেকে বিরত রাখার জন্য সরকারি প্রচেষ্টা জোড়ালো করতে হবে। যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সংসার নামক সুখ-দুঃখের দোলাচল দুলতো সেখানে আজ আনন্দের ক্ষয় ধরেছে, দুঃখের পাল্লা ভারী হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রতি সদাজাগ্রত থাকতে হবে, এরাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রাণস্বরূপ। এদের ভোটেই সরকার পরিবর্তন হয়, দেশে এনজিও উন্নয়ন ব্যবসা চলে। এদের বঞ্চিত করলে প্রাকৃতিক শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে এর সাথে জড়িত শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, শিল্পের কার্যমালা পরিচালনার জন্য স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি ও কাঠামো অনুসরণ অত্যাবশ্যকীয় করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা, বাস্তবসম্মত মজুরি, অবসর সময়, পার্টটাইম কাজ করার নিয়মসহ শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের ভাবনা কার্যকরভাবে ভাবতে হবে। কারণ পোশাক শিল্প ও শ্রমিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। তবে শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে এটাই সকলের প্রত্যাশা, চূড়ান্ত কামনা।
লেখক: শিক্ষক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরাধ বিজ্ঞান গবেষক
E-mail: tawohid@gmail.com