আনন্দ স্কুল : দুর্নীতির খপ্পরে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা

সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশে ২০০৪ সাল হইতে চালু হইয়াছে অনেকগুলি ‘আনন্দ স্কুল’। যেই সকল শিশু শিক্ষার সুবিধা হইতে বঞ্চিত তাহারা এই ধরনের স্কুলে পড়িবার সুযোগ পাইতেছে। স্কুলের নামটাও দেওয়া হইয়াছে সুন্দর — আনন্দের সহিত স্কুলে শিশুদের পাঠলাভ করিবার কথা। ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন’ প্রকল্পের আওতায় এই স্কুলগুলি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে দেশব্যাপী। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এই স্কুলগুলি পরিচালিত হইতেছে। কিন্তু প্রবল দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে এই স্কুলগুলি হইতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাইতেছে না। অনেকক্ষেত্রেই স্কুলগুলি সাইনবোর্ড সর্বস্ব — শিক্ষার্থী নাই, রহিয়াছে কেবল শিক্ষক, অনেকগুলি আবার বন্ধ রহিয়াছে। কিন্তু শিক্ষকগণ ঠিকই বেতন নিতেছেন, তুলিতেছেন শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি-উপকরণের অর্থ। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যাইতেছে যে বিগত অর্থবত্সরে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার আনন্দ স্কুলে ৭৫ লাখ টাকা লোপাট হইয়াছে। ২০১০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ২৮১টি আনন্দ স্কুল চালু করা হয়। সরকার সমর্থকদের তদবিরে প্রতিষ্ঠিত এইসব স্কুল শুরু হইতেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়া পরিচালিত হইতেছিল। ফলত, একের পর এক স্কুল বন্ধ হইতে থাকে। ওই বন্ধ স্কুলগুলিকে আবার শিক্ষা অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা কাগজে-কলমে সবসময় সচল দেখাইয়া উপবৃত্তি এবং বেতনভাতা তুলিতে শিক্ষকদের সহযোগিতা করিয়াছেন বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। অনুসন্ধানে জানা গিয়াছে গজারিয়া উপজেলার আনন্দ স্কুলগুলি এক রকম বন্ধ রহিয়াছে। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা অফিসার এই স্কুলগুলিকে কাগজে-কলমে চালু দেখাইয়া থাকেন স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের নিকট হইতে অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে। আর বন্ধ স্কুলগুলি সক্রিয় দেখাইতে সক্ষম হইবার পর শিক্ষকেরা ওই স্কুলের জন্য বরাদ্দকৃত বেতন-ভাতা-উপবৃত্তির অর্থ অবৈধভাবে গ্রহণ করিয়া থাকেন। উল্টা ঘটনাও ঘটে — ঘুষ না দিলে চালু স্কুলকে বন্ধ দেখানো হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্কুলের বোর্ডের সদস্যরা আনন্দ স্কুলগুলি নিয়া এইরূপ অভিযোগ করিয়াছেন সংবাদপত্রের নিকট। কেবল ফুলছড়ি উপজেলায় নহে, সারাদেশের আনন্দ স্কুলগুলির চিত্র প্রায় একই রকম। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলি সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় তেমন কোনো অবদানই রাখিতে পারিতেছে না। বরং নূতন করিয়া দুর্নীতির জন্ম হইয়াছে প্রান্তিক পর্যায়ে। যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি প্রত্যন্ত পর্যায়ে শিক্ষার আলো ছড়াইয়া দিতে পারিত, সেই স্কুলগুলি দুর্নীতির শেকড় শহর হইতে গ্রামে টানিয়া নিয়া গিয়াছে। ফলে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমসমূহ লইয়া নূতন করিয়া ভাবিতে হইবে নীতিনির্ধারকদের। ইহার পূর্বে সরকারি পর্যায়ে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হইয়াছিল। এনজিও পর্যায়ে রহিয়াছে নানান উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু এই কর্মসূচিগুলির কার্যকারিতা নিয়া প্রশ্নের অবকাশ রহিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, এইসব খাতে যেই অর্থ বিদেশ হইতে আসিতেছে তাহা অনেকক্ষেত্রেই ঋণ আকারে আসিতেছে। ঋণ নিয়া আমরা যেমন একটা দুষ্টচক্রে জড়াইতেছি, তেমনি ইহার মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তার না ঘটাইয়া দুর্নীতির বিস্তার ঘটাইতেছি। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার যেই পরীক্ষিত অবকাঠামো রহিয়াছে, তাহাই আরও বিস্তৃত করা যায় কিনা তাহা নিয়া ভাবা যাইতে পারে। বিদেশি অর্থায়ন আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষায় অধিকহারে বরাদ্দ করা যায় কিনা তাহা বিবেচনায় আনা যাইতে পারে।