রাজধানীর ‘রাজ দস্যু’
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৮
‘আমাদের দিন কেটে যায় ঘুমিয়ে আর রাত কাটে অভিযানে। প্রতি সপ্তাহে টার্গেট থাকে একটি ভাল ‘অপারেশন’। কখনও বাস কাউন্টার বা সিএনজি স্টেশনের ক্যাশ, কখনও ফ্রিজ ভর্তি ট্রাক লুট করি। লুটের তালিকায় মাছের চালানও রয়েছে। এসব কাজের জন্য জীবন কেড়ে নেওয়ার দরকার হলেও আমরা পিছপা হই না।’ কথাগুলো রাজধানীর ‘রাজ দস্যু’ বলে খ্যাত ডাকাত কোরবান আলী ও আল আমীন রবিনের।
গত দুই জুলাই গভীর রাতে রাজধানীর গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার এলাকায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় কোরবান আলী, তার ভাই ইলিয়াস হোসেন ও আল আমিন রবিন। পেটে গুলিবিদ্ধ ইলিয়াস হোসেন বর্তমানে পুলিশ পাহারায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। বন্দুকযুদ্ধে আহত হয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল আব্দুল আজিজ। তিনিও হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।
সেই অভিযানে নেতৃত্বদানকারী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (দক্ষিণ) মোখলেছুর রহমান বলেন, এ যাবত্কাল যেসব ছিনতাই বা ডাকাত চক্র গ্রেফতার হয়েছে তাদের সবার থেকে এরা আলাদা ও ভয়ংকর। দস্যুদের রাজাই বলতে হবে। তিনি আরো বলেন, এরা ছিনতাই কাজে ব্যবহার করে পিকআপ ভ্যান। গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। এদের কাজ কারবার শুরু হয় গভীর রাতে। আর অভিযানে বের হবার আগে এরা মিলিত হয় গোলাপ শাহ মাজারে। ইতিমধ্যে এ চক্রটি মালিবাগ রেলগেইট সংলগ্ন সোহাগ পরিবহনের কাউন্টার, মগবাজারের সিএনজি স্টেশন আনুদ্বীপের ক্যাশ কাউন্টারে যাত্রী ও কাস্টমার সেজে টাকা ও ল্যাপটপ লুট করেছে। অন্যদিকে কাঁঠালবাগান এলাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে লুট করে ৮৪ লাখ টাকা। ট্রাক ভর্তি ফ্রিজও লুট করে বিক্রি করেছে শাহবাগ এলাকা থেকে। তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ, রমনা, কলাবাগান, বংশাল, কোতোয়ালীসহ নগরীর বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে এ চক্রটিকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে আসছিল। এডিসি (দক্ষিণ) জানান, গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য ব্যবহার করে বৃহস্পতিবার হারুন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে লুণ্ঠিত চারটি ফ্রিজ।
গ্রেফতার হওয়া কোরবান আলীকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রবিন গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে তার রিমান্ড মঞ্জুর করেনি আদালত। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের অপর সহযোগীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
দিন কাটে ঘুমিয়ে রাত কাটে অভিযানে ঃ গত বুধবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা দফতরে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় কোরবান আলীর। তার বয়স বিশ। বাবার নাম সোবাহান ব্যাপারী। গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর থানার শিবচর। চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। পড়াশুনা অষ্টম শ্রেণি। বাসা রামপুরা ওয়াপদা রোডে। কোরবান জানায়, সে এক সময় তার ভাই ইলিয়াসের সঙ্গে কারওয়ানবাজার সবজি আড়তে কাজ করতো। এখানে কাজ করার সুবাদে জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কর্মকাণ্ডে। বছরখানেক আগে ফ্রিজ ভর্তি ট্রাক ছিনতাই করার অভিযোগে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। কয়েকদিন জেল খাটার পর জামিনে ছাড়া পায়।
কোরবান আলী আরও জানান, তাদের অভিযান হয় গভীর রাতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজ শেষ করে বাসায় ফেরে। কোরবান আলী ১২টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ছিল বলে জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি পিকভ্যান গাড়ির সামনে বসা ছিলেন। পেছনে যারা ছিল তারাই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। তবে তারা অধিকাংশ ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে দা, চাপাতিই বেশি ব্যবহার করে থাকে।
আল আমিন ওরফে রবিন। তারও বয়স ২০ থেকে ২২ এর মধ্যে। গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার কাঁচারাকান্দি। বাবার নাম বাচ্চু মিয়া। বাসা খিলগাঁও। ঘটনার দিন পালাবার সময় পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন। গুলি তার বাম উরুতে লাগে।
রবিন বলেন, গভীর রাতে তারা পিকআপ ভ্যান নিয়ে ‘ছিনতাই অভিযানে’ বের হতেন। তাদের টার্গেট থাকতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাস বা সিএনজি স্টেশনের ক্যাশ কাউন্টার। তাদের সীমানা কারওয়ান বাজার সোনারগাঁও মোড় থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। অভিযানে আগে তারা সবাই মিলিত হতো গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার এলাকায়। তবে সবদিনই অভিযান হতো না। এক, দুই অথবা তিনদিন পর তারা অভিযানে বের হতেন। টার্গেট সব দিনই সফল হতো না। প্রায়ই ব্যর্থ হতো। তাছাড়া ইদানীং পুলিশের টহল বেড়ে যাওয়ায় তাদেরকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হতো।
সেই রাতে কী ঘটেছিল ঃ এ চক্রটিকে ধরতে মহানগর পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিল। কিন্তু এর আগে প্রতিটি অভিযানে এসেছে ব্যর্থতা। গত সোমবার রাত দুইটার দিকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারেন চক্রটি গোলাপ শাহ মাজার এলাকায় মিলিত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এডিসি মোখলেছুর রহমান, এসি জাহিদুল হক, ইন্সপেক্টর নুরুল আমিন, ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আলীসহ একটি টিম ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাত চক্রটি গুলি করতে করতে পিকআপ ভ্যানযোগে পালাবার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। উভয়পক্ষের গুলি বিনিময়ের সময় পুলিশের কনস্টেবল আব্দুল আজিজ আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় তিন দস্যুকে গ্রেফতার করে। অন্যরা পালিয়ে যায়।