পরলোকে স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য আর নেই। তিন বছর ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর পৃথিবীকে বিদায় জানালেন। শুক্রবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে ধানমন্ডির আহমেদ মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। স্ত্রী কুমকুম ভট্টাচার্য এবং ছেলে পার্থ ভট্টাচার্য ও মেয়ে মল্লিকা ভট্টাচার্যসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী, ভক্ত, বন্ধু, স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর খবরে শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিপুল ভট্টাচার্যের শবদেহ শুক্রবার দুপুর ৩টার পর বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। এর আগে তাকে ছায়ানট ও মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদী হাউজিং-এর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সকাল ১১টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ এখানে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাবেন। পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। শুক্রবার সকালে বিপুল ভট্টাচার্যের মৃত্যুর খবর শোনার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সহযোদ্ধাদের অনেকেই ছুটে যান হাসপাতালে। তারা পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। হাসপাতাল থেকে বেলা ১২টার পর শিল্পীর মরদেহ নিয়ে আসা হয় ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে। তিনি ছায়ানটের লোকসঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০১০ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বিদায়বেলায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয় অন্তিম শ্রদ্ধা। ছায়ানটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফুলের ভালোবাসার পাশাপাশি শ্রদ্ধা জানায় আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে গানের সুরে। এ সময় ছায়ানটের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ ও ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানান স্বাধীন বাংলা বেতারের চার শিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল, ফকির আলমগীর, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ও ডালিয়া নওশীন এবং কণ্ঠশিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, চন্দনা মজুমদার, সঙ্গীত পরিচালক নজরুল ইসলাম প্রমুখ। সহযোদ্ধার প্রয়াণে ব্যথিত ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বলেন, বিপুল ছিল অনেক বড় মাপের শিল্পী। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিত্সার জন্য তেমনভাবে সরকারি কিংবা বেসরকারি সহায়তা পাননি। ডালিয়া নওশীন বলেন, আমরা দু’জন কাছাকাছি বয়সের। স্বাধীন বাংলা বেতারের আগে আমরা একসঙ্গে বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থাতেও কাজ করেছি। বিপুল ছিল খুব চঞ্চল স্বভাবের। ওর কণ্ঠে পল্লীগীতি শুনে অবাক হয়েছিলাম। লোকগান গাওয়ার ক্ষেত্রে বিপুলের একটা নিজস্ব ধরন ছিল। মনোরঞ্জন ঘোষাল বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীর চিকিত্সার জন্য অর্থকষ্টে ভুগবে এটা মেন নেয়া যায় না। তারেক মাসুদ নির্মিত মুক্তির গান চলচ্চিত্রের ১১টি গানের মধ্যে ১০টিতে ছিল বিপুলের কণ্ঠ। ১৯৫৩ সালের ২৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন বিপুল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর কণ্ঠযোদ্ধা হিসাবে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তিনি মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থারও সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৩ জুন বিয়ে করেন কুমকুম ভট্টাচার্যকে। একই সালে তিনি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। গান গেয়ে ও গান শিখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন বিপুল ভট্টাচার্য।