গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে ‘কঠিন চ্যালেঞ্জে’ ইসি
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২৩:৩৬
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ‘কঠিন চ্যালেঞ্জে’ পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় নির্বাচন হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কট্টর পরস্পর বিরোধী অবস্থানে চলে যাওয়ায় অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে কমিশন। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তের এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের আস্থা-অনাস্থা এবং পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার নিয়েও সংকটে আছে ইসি।
গত ১৫ জুন চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেও ইতিমধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে ভোট কারচুপির আশংকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইসি’র নিজস্ব ১৯ পর্যবেক্ষক থেকে ১২ জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আবার আচরণ বিধি নিয়ন্ত্রণে নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। কাড়িকাড়ি টাকা বিতরণও চলছে। এই পরিস্থিতিতে ‘চার সিটির (রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট) মতো ভোট সুষ্ঠু হবেতো, আমার ভোট আমি দিতে পারবোতো, প্রশাসন যন্ত্র কি পক্ষপাতিত্ব করবে, হট্টগোল উত্তেজনা থাকবে নাকি কেন্দ্রে - ভোটারদের মনে ইত্যকার নানা ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ভোটাররা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন। বাইরের কাউকে পেলেও জিজ্ঞাসা করছেন।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ আশ্বস্ত করে বলেছেন, ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে তার জন্য সব করা হয়েছে। কোন ধরনের অনিয়ম হলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেকোন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘কমিশন নিজস্ব গতিতে নির্বাচন পরিচালনা করছে। গাজীপুরের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ১২ হাজার ৪১৬ জন সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। সবাই নিষ্ঠার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন নিয়ে শংকা বা সংশয় থাকার কোন কারণ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল ঘোষণা নিয়েও ইতিমধ্যে এক ধরনের বিতর্ক জন্ম দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ মতিয়ার রহমান বলেছেন, শনিবার ভোট গণনা শেষে পরদিন সকাল ১১টায় মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের ফল এক সঙ্গে ঘোষণা করা হবে। তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। যদিও পরে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপে রিটার্নিং অফিসার তার বক্তব্য থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হন। ভোট গ্রহণ শেষে রাতেই ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে পরে জানানো হয়েছে।
গত ১৫ জুন চার সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বর্তমান কমিশনের প্রতি আস্থা বাড়ে ভোটার ও সাধারণ মানুষের। ওই নির্বাচন ছিল কমিশনের কাছে অগ্নিপরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নতুন পরীক্ষা দিচ্ছে কমিশন। আর এই পরীক্ষার পর হবে জাতীয় নির্বাচন অর্থাত্ ফাইনাল পরীক্ষা। স্থানীয় সব নির্বাচনে সরকার ও বিরোধী দল নির্বাচনমুখী হওয়ায় রাজনীতিতে বিরাজমান সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। সরকারি দল নির্বাচনে জয়ের ধারায় ফিরতে আর বিরোধী দল জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে মরিয়া হয়ে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে জয় পেতে চাইছে। এজন্য তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের উপর। স্থানীয় নির্বাচনে দুই দলের প্রভাব বিস্তারের মুখে নিরব ভূমিকায় রয়েছে কমিশন। গত বৃহস্পতিবার প্রায় এক ঘন্টা আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সিইসিসহ চার নির্বাচন কমিশনারের বৈঠককে বাঁকা চোখে দেখছে অনেকে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিনিধি দল বারবার কমিশনে গিয়ে সুর্নিদিষ্ট কোন তথ্য না দিয়ে ঢালাওভাবে অভিযোগ করে আসছে। তারাও নানাভাবে কমিশনের উপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসন রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীনস্থ হলেও তার কমান্ড মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব হওয়ায় অনেকটা তাকে পাশ কাটিয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। দৃশ্যত কমিশনের সাংবিধানিক কর্মে হস্তক্ষেপ চলছে। তাছাড়া ৩৯২ জন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগ ১৪ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে। তারা ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা। আর বিএনপি ৮১ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তার তালিকা ইসিতে জমা দিয়ে বলেছে, তাদের দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ অন্য চার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সাত জন পর্যবেক্ষক ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কোন কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বে নেই। আকস্মিকভাবে ১২ জন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যাদের দায়িত্ব ছিল মাঠ পর্যায়ের তথ্য জানানোর। কমিশনের বাইরের নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন ৩৯২ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ২ হাজার ২৮৯ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, ৪ হাজার ৫৭৮ জন পোলিং অফিসার, সাড়ে ১২ হাজার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।
পর্যবেক্ষকদের মতে, গাজীপুরের অগ্নিপরীক্ষার বৈতরণী পার হতে পারলে ‘নির্বাচন কমিশন’ পরীক্ষিত বলে প্রতীয়মান হবে। আস্থা বাড়বে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি।