গণতন্ত্রের পিরামিড ও আমরা
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৩, ২১:৪৩
জীবন দিয়ে হলেও গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার ঘোষণা দিয়ে ছিলেন মুরসি। এই ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টা না পেরুতেই অক্ষত জীবন আর বিপদগ্রস্ত মিসরকে অরক্ষিত রেখেই উত্খাত হলেন তিনি। জেনারেল আবদেল ফাতাহ আল-সিসি ক্ষমতা গ্রহণ করে নির্বাচনের আগে সাংবিধানিক পরিষদ দ্বারা দেশ শাসনের কথা ঘোষণা করেন। সকাল বেলা অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় দৈনিক সিডনি মর্নিং হেরাল্ড খুলে দেখি মিশর ও এর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জমজমাট পত্রিকাটি মুখরোচক খবরের পাশাপাশি মূল্যবান প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, অভ্যুত্থান মানেই অভ্যুত্থান, আর অভ্যুত্থানের নায়ক আল- সিসি নির্বাচনের কথা বলেছেন বটে, তবে কখন ও কবে সে বিষয়ে কিছুই বলেননি, মিসরের অতীত ও দেশে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের নজির টেনে এনে এ নিয়ে ঠাট্টা করতেও কসুর করেনি।
পশ্চিমা গণতন্ত্রের এটাই স্বভাব, তারা নিজেদের বেলায় একশ’ পার্সেন্ট গণতন্ত্রী। একবার যদি কেউ তাদের ভূ-খণ্ডে বসবাস শুরু করেন বা জীবন-যাপন করেন বুঝতে পারবেন প্রকৃত গণতন্ত্র ও জীবনবোধ কাকে বলে, এই এরাই বাদবাকি দুনিয়ার জন্য অন্য চেহারা আর ভিন্ন আকৃতির, মিশর নিয়ে যারা আরব বসন্ত আরব বসন্ত বলে গলা ফাটিয়েছে তাদের বলি— দেখলেন তো, পশ্চিমা প্রভুরা খেলার পুতুল বানিয়ে ফেললে কি হয়? ভেতরে যাই থাক মিসর চলছিল উদার নৈতিক কায়দায়। এটা সত্য যে, মোবারকের দীর্ঘ শাসন কাল নিরপেক্ষ বা গণতান্ত্রিক কিছু ছিল না। তাছাড়া তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকাটাও অস্বাস্থ্যকর, অশোভনীয়, কিন্তু মোবারকের মত শাসক তা মানবেন কেন? তাছাড়া তিনি তো একা কেউ ছিলেন না, মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই রাজা-বাদশাহ আর অগণতন্ত্রের ছড়াছড়ি, তার ঢেউ পাশের দেশ মিশরে গিয়ে লাগবে এটাই তো স্বাভাবিক, মোবারকের পতন উল্লাস শেষ হবার পর দু’ বছরও টিকলেন না মুরসি। মুরসির এই পতন বা উত্খাতের পেছনে যে তারুণ্য ও শুভ বুদ্ধি কাজ করেছে তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই। অন্তত: গোঁড়া মৌলবাদ ও অন্ধত্বকে তো রোখা গিয়েছে। কিন্তু তার প্রতিবিধান কি সামরিক হস্তক্ষেপ? আল-সিসি অভ্যুত্থানের পূর্বে সেখানকার উদার নৈতিক প্রভাবশালী মহল ও সে দেশের খৃস্টান নেতাদের সাথে কথা বলেই এগিয়েছেন। উদার জীবন ও শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় মিসর ও তার ঐতিহ্যের গতি বাড়ুক, সেখানকার মানুষের জীবন ও ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল হোক, কিন্তু প্রচ্ছন্ন সেনা শাসনের নাগপাশ ছিঁড়ে একনায়কতান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্ত হওয়া দেশটি এত তাড়াতাড়ি আবার এমন উতলা পরিস্থিতির শিকার হল কেন? এর উত্তর খোঁজার জন্য পন্ডিত হবার প্রয়োজন নেই, মাত্র কিছুদিন আগে অস্ট্রেরিয়ার রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনেই এর উত্তর আছে। এ দেশের এখন নারী প্রধানমন্ত্রী স্বঘোষিত নাস্তিক জুলিয়া গিলার্ড দলীয় নীতি নির্ধারকদের ভোটে হেরে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছে রাজনীতি থেকেও নির্বাসনে যাবেন, চিরতরে। তাঁকে যিনি হারালেন সেই ভদ্রলোক অর্থাত্ এখন যিনি প্রধানমন্ত্রী, সুদর্শন কেভিন রাড, তাঁর কপালেও একই কলঙ্কতিলক জুটেছিল। দলীয় ভোটে তিনিও হেরেছিলেন এই জুলিয়ার কাছে, তাকেও কেঁদেকেটে বিদায় নিতে হয়েছিল, কেভিনের ক্লিন ইমেজ কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এলেও লেবার দলের নীতি নির্ধারকরা তাকে হটিয়ে জুুলিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে দ্বিধা করেননি— এই যে উলটা পালটা বা ওলট-পালট, এর কোনটাতেই জনগণের মাঠে নামতে হয়নি। রাজপথে নামেনকি কেউ। গণতন্ত্রে যে ভোটাধিকার বা ক্ষমতা তা কেবল গদি পাবার জন্য নয়, বা বিরোধী দলকে হেনস্থা করবার জন্যও নয়, তার প্রয়োগ আত্মশুদ্ধি আত্ম বিশ্লেষন আর দলের স্বচ্ছতার জন্যও জরুরি। সে জাতীয় স্বচ্ছতা আর সত্সাহস আছে বলেই লেবার দলের সাংসদরা শীর্ষ নেতৃত্বকে হটিয়ে দিতে একটুও ভয় পায়নি।
আমাদের দেশ বা মিসরে যা ভাবাও অন্যায়। আমাদের গণতন্ত্র এখনো পরিবার, গোষ্ঠী আর সামাজিক বন্ধনের বাইরে পা রাখতে শেখেনি। দেশেই দেখুন, ভগ্নি, সন্তান আর পরিবারের দাপটে জনগণের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। গোষ্ঠীতন্ত্র আর সন্তানতন্ত্রের সাথে যোগ হয়েছে উগ্র অন্ধত্ব। ধর্মান্ধতা। এগুলো কোন দেশ বা জাতিকে পথ দেখাতে পারে না, পথ দেখানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা। আমাদের দেশে এখন তার বড়ই আকাল। কোন দলই কথা শুনছে না, কেউ ভাবছে আমার টিকিটিও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। অন্যরা ভাবছে বসন্ত নামের গণঢেউই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ক্ষমতায়। ভুল, মিসর যেন আমাদের দাঁত দেখিয়ে বলছে “সাবধান” জামাল আব্দুন নাসের, আনোয়ার সাদাত, হোসনি মোবারকের পর মিসরের আকাশে গণতন্ত্রের ধূমকেতু উঠতে না উঠতেই ধুলায় পড়ে গেল। তার মানে কি এই যে, এখনো প্রস্তুত নয়, তারা এখনো গণতন্ত্রের জন্য তৈরী হয়নি। মমীর দেশ, পিরামিডের এই দেশ বলে দিচ্ছে, অন্ধ আমেরিকা-প্রীতি ভালো নয়, ভালো নয় গণতন্ত্রে নামে পাশ্চাত্যের পদ লেহন-এ দুই সত্য আমাদেরও আনতে হবে। তাহলেই উন্নয়নশীল দেশগুলো শান্তি ও অগ্রগতির পথে চলতে পারবে।
লেখক :সিডনী থেকে
Dasguptaajay @ hotmait.com