অন্ধকার থেকে আপন আলোয়
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২০:০৯
নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে: মৌরি
হাসিখুশি চেহারার মৌরির বয়স ২৮। উচ্চশিক্ষিত হয়ে দেশে এসে বিমানবন্দরের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া মৌরি ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সুখী। কিন্তু মনের অজান্তে মৌরি পা দিয়ে ফেলেছে মাদক নামক অন্ধকার জগতে। মৌরির সরলতার সুযোগে অল্প কয়েকদিনের পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে ফেলে উচ্চবিত্ত সমাজের কয়েকজন। ঢাকার বাইরে চাকরি করা স্বামীর অবর্তমানে মৌরিকে সময় দিতে থাকে তারা। মৌরি নিজের অজান্তেই এসব মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীদের বিছানো ফাঁদে পা দেয়। দীর্ঘ দেড় বছর পর স্বামী জানতে পারে মৌরির ভিন্ন জগতের কথা। দ্রুত নিয়ে আসে আপনগাঁওয়ে।
আপনগাঁওয়ের কর্মকর্তা-প্রশিক্ষকদের চেষ্টায় অন্ধকার থেকে ফিরে আসা মৌরির উপলব্ধি জানতে চাইলে সে জানাল, নিজের প্রতি প্রচণ্ড রকম ক্ষোভ হচ্ছে। আগে যদি জানতাম নিজের কত বড় ক্ষতি করছি, তাহলে এ পথে পা দিতাম না। আমি আমার একমাত্র মেয়ের প্রতি অন্যায় করেছি। এখন থেকে মেয়েকে আগের চেয়ে বেশি সময় দিব। বদলে যাওয়া মৌরির জীবনের অন্যতম উদ্দেশ মাদকাসক্তদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে, এদের পুনর্বাসনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু করা। উচ্ছন্নে যাওয়া বড়লোক বাবা-মায়ের যেসব ছেলে-মেয়েদের কুসঙ্গে পড়ে মৌরির মত নিরীহ তরুণ-তরুণীরা তাদের জন্য মৌরির পরামর্শ, পাঁচ মিনিটের সাময়িক সুখের জন্য কেউ যাতে জীবন থেকে পাঁচ মাস নষ্ট না করে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই খুব সচেতন হতে হবে।
নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই: বৃষ্টি
বর্ষা ঋতুর উচ্ছলতাও যেন হার মানবে মিষ্টি চেহারার ছোট্ট বৃষ্টির করুণ চাহনি দেখলে। ১৬ বছরের বৃষ্টির মা নিজেই নিষিদ্ধ পল্লীর বাসিন্দা। বিক্রি করেন বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। মাত্র দশ বছর বয়সে মাকে ছেড়ে ছোট্ট মেয়েটি চলে আসে ঢাকায়। অন্য আট-দশজন পথশিশুর সঙ্গে রেললাইন, ফুটপাতে খেয়ে না খেয়ে রাত্রিযাপন। এইটুকুন বয়সে মা-বাবাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট সইতে না পেরে কান্নাকাটি করাটাও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। বান্ধবীর পরামর্শে প্রথম ড্যান্ডির নেশা করে বৃষ্টি, সেই থেকে শুরু।
সদরঘাটের ফুটপাতে কয়েকজনের একটি পথশিশুর দলের সঙ্গে থাকত বৃষ্টি। একদিন পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন এনজিও অপরাজেয় বাংলার এক কর্মকর্তার দৃষ্টি পড়ে ছোট্ট ফুটফুটে বৃষ্টির দিকে। বৃষ্টিকে তিনি নিয়ে যান অপরাজেয় বাংলার পুনর্বাসন কেন্দ্রে। কিন্তু নেশার টানে দু’বার সেখান থেকেও পালিয়ে যায় সে। এরপর আপন নিবাসের কর্মকর্তাদের কাছে বৃষ্টিকে হস্তান্তর করে অপরাজেয় বাংলার কর্তারা। মাদক ব্যবসায়ী মায়ের কাছে ফিরতে চায় না বৃষ্টি। পুরোপুরি সুস্থ বৃষ্টি এখন প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। দাঁড়াতে চায় নিজের পায়ে।
নিজে টাকা খরচ ছাড়াই দেড় বছর
মাদক নিয়েছে: নাফিসা
ধানমন্ডির একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াশোনা করে নাফিসা। ক্লাস সেভেনে প্রথম খালাত ভাইয়ের বউয়ের মাধ্যমে নাফিসার মাদক নেয়ার হাতেখড়ি। কিন্তু বড়লোক ব্যবসায়ী বাবা নিজে মাদকাসক্ত হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের মাদকের সঙ্গে পরিচিত সে। ছোট সময়ে ওর মাধ্যমে যখন বাবা প্যাথেড্রিন সংগ্রহ করত, বিষয়টি নাফিসার মনে দাগ কেটেছে। কিন্তু বাবা কখনোই সচেতন হননি। প্রায় দেড় বছরের মাদকাসক্ত নাফিসাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠালেও নিজে এখনো নিয়মিত নেশা করেন। এই কারণে প্রথম দিকে নাফিসার মাদক গ্রহণ করাটাকে তেমন খারাপ মনে হয়নি। স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডাচ্ছলে মাদক নেয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুরুর সময়গুলো এখন আর মনে করতে পারে না নাফিসা। ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পর নিজেকে অন্য জগতে ভাবতে শুরু করাটাই ছিল প্রধান নেশা। বাবা-মায়ের আদেশ-নির্দেশ-উপদেশকে কোন পাত্তা না দিয়ে নিজের মত, নিজের জগতে চলতে ভাল লাগত। প্রচণ্ড রকম মেজাজ খিটখিটে থাকত। বাসায় ফেরার পর মা বকতে পারে সেই ভয়ে হাত কেটে আহত দেখানোর চেষ্টাও ছিল।
অন্ধকার জগতের দুর্বিষহ উপলব্ধি জানতে চাইলে নাফিসা জানাল, দেড় বছর বন্ধুরাই আমাকে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য দিয়েছে। এবং ওদের আড্ডায় যেয়েই সবসময় মাদক গ্রহণ করেছি। এর জন্য কোনদিন আমাকে টাকা খরচ করতে হয়নি। ঘুমের ওষুধ, কিংবা ঠাণ্ডার সিরাপ এসবের সবই পেতাম বন্ধুদের কাছ থেকে। সুুস্থ হয়ে ফিরে গিয়ে ওর অন্য সব বন্ধুদেরকে বোঝাবেন যে মাদক মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিয়ে জীবন থেকে জীবনকেই কেড়ে নিয়ে যায়।