গুপ্তচরবৃত্তির তথ্য ফাঁস

মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে অস্বস্তিতে যুক্তরাষ্ট্র

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের মিত্র দেশগুলোর ওপর গুপ্তচরবৃত্তির তথ্য ফাঁসের পর অস্বস্তিতে পড়েছে বিশ্বের মহাপরাক্রমশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে দেশটি এখন আস্থাহীনতার মধ্যে পড়েছে। দেশগুলোর সরকারও এখনো বিপাকে পড়েছে। সরকারগুলোর পক্ষ থেকে কড়া মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য এবং তথ্য বিনিময় স্থগিত করারও হুমকি দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রয়োজনেই এটা করা হয়েছে বলে বললেও তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না মিত্র দেশগুলো। তথ্য ফাঁসকারী এডওয়ার্ড স্নোডেন বলেছেন, আমরা সর্বত্র সবাইকে হ্যাক করি। গত ৩০ জুন জার্মানির ‘ডার স্পাইগেল’ ম্যাগাজিনে গোপন মার্কিন নথির ঊদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্রান্স, ইতালি এবং গ্রিসসহ বন্ধুপ্রতিম ইউরোপীয় দেশগুলোর দূতাবাস এবং ইইউ মিশনগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি করছে। বহুল আলোচিত মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেন এ তথ্য ফাঁস করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওয়াশিংটন কার্যালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আড়ি পেতে অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেছিল। এছাড়া আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) ইইউকে তাদের টার্গেট হিসেবে উল্লেখ করেছে। পত্রিকাটি বলছে, তারা স্নোডেনের কাছে ২০১০ সালের একটি সর্বোচ্চ গোপনীয় নথিতে দেখেছে কিভাবে ইইউর অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানো হয়। স্নোডেন জানিয়েছে, প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ফোন, ই-মেইল এবং অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যে বার্তা বিনিময় হচ্ছে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা নজর রাখছিল। যুক্তরাষ্ট্র টেলিফোন কল বা আলাপই শুধু শুনছে না, বিভিন্ন নথি ও ই-মেইলেও উঁকি দিচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রম ফাঁসের সর্বশেষ ঘটনা। ডার স্পাইগেলে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ইইউর ব্রাসেলস কার্যালয়ের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকেও এনএসএর টার্গেট করা হয়েছে। তথ্যের উত্স প্রকাশ না করে ম্যাগাজিনটি জানিয়েছে, পাঁচ বছর আগে ইইউ কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বেশ কিছু মিসকল লক্ষ্য করেন, কলগুলো ব্রাসেলসের ন্যাটো কম্পাউন্ডে অবস্থিত এনএসএর দপ্তর থেকে করা হয়েছে বলে শনাক্ত করেন। এনএসএ এভাবে আড়ি পেতে ইইউর কোনো তথ্য নিয়েছে কি না এবং নিলেও কোন ধরনের তথ্য নিয়েছে তা জানা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রশাসন জার্মানির কমপক্ষে ৫০ লাখ ফোনকল, ই-মেইল ও টেক্সট মেসেজে নজরদারি করেছে। ‘জার্মানি তৃতীয় শ্রেণীর অংশীদার’ শীর্ষক মার্কিন গোপন নথির বরাত দিয়ে ডার স্পাইগেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কর্তৃপক্ষের করা শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর অংশীদার। ইইউভুক্ত দেশের মধ্যে জার্মানির ওপর বেশি নজরদারি করে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র চীন, ইরাক বা সৌদি আরবের মতোই জার্মানির ওপরও একইভাবে নজরদারি করে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা ওয়াশিংটনে ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও রেখেছিলেন গোপন ডিভাইস। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে এতথ্য বেরিয়ে আসায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গার্ডিয়ান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও তুরস্কের দূতাবাসও রয়েছে এই তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই গোয়েন্দা নজরদারিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বন্ধুভাবাপন্ন এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। আজ সোমবার অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউর মধ্যে বাণিজ্য আলোচনায় এ ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন পর্যন্ত ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যচুক্তি। ইইউ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা ভ্রমণবিষয়ক তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করারও হুমকি দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন, ইইউ দূতাবাসে আড়িপাতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইইউর একটি প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করা হতে পারে। তিনি হুঁশিয়ার করেন, অবিলম্বে আড়িপাতা বন্ধ করার ঘোষণা না দিলে সব ধরনের আলোচনা রহিত করা হবে। ফ্রান্সের চলচ্চিত্র ও অনলাইন বিনোদন খাত যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড ও সিলিকন ভ্যালির তোপের মুখে পড়বে না ইইউ থেকে এমন আশ্বাস পাওয়ার পরই গত জুন মাসে ফ্রান্স চুক্তির বিষয়ে আগ্রহী হয়। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের মুখপাত্র স্টিফেন সেইবার্ট বলেন, মিত্রদের ওপর গোয়েন্দাগিরি অগ্রহণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধকালীন আচরণ আমরা মানবো না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুক্তিটি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আগে পারস্পরিক বিশ্বাস জরুরি। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমা বোনিও বলেন, রোম ওয়াশিংটনের কাছে এ যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্কের ব্যাখ্যা চেয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি মার্টিন শুলজ বলেছেন, প্রতিবেদনটি সঠিক হলে ইইউর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর জনগণ মনে করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তাদের দেশের জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টিই বিবেচনা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইউরোপীয় এবং এশিয়ার দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থে গোয়েন্দা নজরদারি করছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাই করছে। এর বেশি কিছু নয়। এটা বিশ্বাসহীনতার বিষয় নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এনএসএ প্রচলিত আইন ও বিধি মেনেই গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি সন্দেহজনক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আলামত পেলেই টেলিফোন ও ইন্টারনেটে নজরদারি করে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, নজরদারির মাধ্যমে তারা বিশ্বের ৫০টির বেশি জঙ্গি হামলা নস্যাত্ করতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নজরদারি নতুন কিছু নয়। ঊনবিংশ শতকে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সময়ও টেলিগ্রাফে এবং পত্রিকার প্রতিবেদনের উপর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হতো। সেটি ছিল সফল। কিন্তু বর্তমানের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় কিছুটা হলেও ব্যর্থতার দিকে গেল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রও ছাড়বার পাত্র নন। সিলিকন ভ্যালি যুক্তরাষ্ট্রকে গোয়েন্দা নজরদারিতে সুপারপাওয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারাও দরকষাকষি করতে পারে। কারণ তাদের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং প্রতিরক্ষাগত সব শক্তি আছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এত পরিমাণ তথ্য আছে যা বলাই বাহুল্য। বিশ্বের কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমের শতকরা ৯০ ভাগ তাদের। বিশ্বের অনলাইনে অনুসন্ধানকারীদের দুই-তৃতীয়াংশ ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক গুগল ইনকর্পোরেশনের। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ফেসবুকের আছে ৯শ’ মিলিয়ন বা দুই দশমিক ৭ বিলিয়ন অ্যাকাউন্ট। জি-মেইলের ব্যবহারকারী গতবছর ছিল ৪২৫ মিলিয়ন এবং রয়েছে সানফ্রান্সিসকোভিত্তিক টুইটার এবং ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ওয়াটস অ্যাপ্লিকেশন। যুক্তরাষ্ট্র গত দু’বছরে ফেসবুক ফ্যানদের ‘লাইক’ জয় করতে খরচ করেছে ৬ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। ফেসবুক এবং টুইটারকে কিভাবে কূটনীতিতে ব্যবহার করা যায় তার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি। এসব কারণে তারা মিত্র দেশগুলোকে চাপে ফেলতে পারে। তাছাড়া অনেক দেশের সরকার ক্ষমতায় থাকতে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নাও নিতে পারে। জার্মানিতে আগামী ১১ মাস পর নির্বাচন। মার্কেল তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। ভারতেও আগামী বছর নির্বাচন। তাই ভারতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। বরং স্নোডেনের আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গতবছর ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস কোর্টে গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর জন্য ১৭৮৯টি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। ২০০১ থেকে ১৫ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়েছে।