তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের

ডেথ ভ্যালি। যার বাংলাটা হয়তো সবারই জানা— মৃত্যু উপত্যকা। নাম শোনার পরই উপলব্ধি হওয়ার কথা, ওখানে বিপজ্জনক কিছু একটা রয়েছে। সত্যিই তাই। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মরু এলাকা ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা প্রতিবছরেরই একটা সময়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যের মরু এলাকাকেও হার মানায়। আর এবছরের যা অবস্থা, তাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে পালানোর উপক্রম হয়েছে। গত ৩০ জুন এখানকার তাপমাত্রা পৌঁছেছিলো ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এমন পরিস্থিতিতেও উদ্বিগ্ন ছিলেন না ডেথ ভ্যালির বাসিন্দা মাইক উড। কারণ তিনি অত্যধিক তাপমাত্রায় অভ্যস্ত। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন, জুতা কুঁচকে যাচ্ছে, পায়ে ফোসকা পড়ে যাচ্ছে আর রাস্তার পিচ রূপ নিচ্ছে তরল পদার্থে, তখন তার সতর্ক না হয়ে উপায় ছিল না। এরপর কয়েকদিন তিনি বাড়ি থেকে বের হননি হিট স্ট্রোকের ভয়ে। একশ’ বছর আগে ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই ডেথ ভ্যালির গ্রিনল্যান্ড র্যাঞ্চ-এ তাপমাত্রা ছিল ৫৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সেই বিশ্ব রেকর্ড এবার ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন রেকর্ড লেখার প্রয়োজন পড়তে পারে। এবারের তাপপ্রবাহ শুরু হয় রেকর্ডের শতবর্ষ পূর্তির মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। অসহ্য গরমের কারণে ডেথ ভ্যালির বাসিন্দাদের অনেকেই পানিশূন্যতা ও দুর্বলতায় ভুগছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রচণ্ড গরমে ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষ হাঁসফাঁস করছে। নেভাদা, অ্যারিজোনা, ইডাহো, কলারোডো, উটাহ ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অবস্থাও সুবিধার নয়। গত সোমবার এক বৃদ্ধকে মৃত পাওয়া যায় তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণহীন অ্যাপার্টমেন্টে। ডাক্তাররা জানান, অত্যধিক গরমই তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই রাজ্যগুলোর কমিউনিটি সেন্টার, হোমলেস শেল্টার ও লাইব্রেরিতে শীতলীকরণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব রাজ্যে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে জনজীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। তার লক্ষণও দেখা গেছে। লাস ভেগাস শহরে খোলা আকাশের নিচে একটি কনসার্টে দর্শনার্থীদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ৩৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। লসএঞ্জেলসে তাপদাহের কারণে পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা নিয়েছেন প্রায় হাজার খানেক লোক। এদের সবারই এক কথা, এতো গরম আমরা সহ্য করতে পারছি না। জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা গত সপ্তায় দেশের পশ্চিমের কিছু কিছু এলাকার জন্য তাপপ্রবাহ-সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করে এবং পরামর্শ দেয়, খুব বেশিক্ষণ বাড়ি কিংবা কর্মস্থলের বাইরে না থাকতে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব অঞ্চলের উচ্চ তাপমাত্রা আস্তে আস্তে কমে আসবে। তবে সহসাই বড় ধরনের পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু তাপপ্রবাহ উত্তরের দিকে অগ্রসর হতে পারে। অবাক করার মতো বিষয় হলো— রাতের বেলায়ও তাপমাত্রা খুব বেশি কমছে না। ফলে যাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকার সামর্থ্য নেই, তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কর্মস্থলে এসে তারা ঝিমোয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। অনেককে সইতে হচ্ছে কর্তাব্যক্তিদের চোখ রাঙানি। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা অ্যারিজোনাকে নিয়ে। এ অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এখান দিয়েই মেক্সিকো থেকে অবৈধভাবে লোকজন আমেরিকায় পা রাখে। মরুভূমিতে প্রচণ্ড গরম সইতে না পেরে এরকম পাঁচজনের জীবনপ্রদীপ এরই মধ্যে নিভে গেছে। এদেরকে ঠেকাতে ইউএস বর্ডার পেট্রোল তাদের টহল জোরদার করেছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো— অবৈধ অভিবাসীদের মৃত্যু ঠেকাতে গিয়ে গরমের চোটে সীমান্তরক্ষীরা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এতে কর্তব্য পালনের ব্যাপারে তাদের মধ্যে অনীহা কাজ করছে। শুধু মানুষ নয়, জীবজন্তুও গরমে কাহিল হয়ে পড়েছে। ডেথ ভ্যালির ন্যাশনাল পার্কের কোনো প্রাণীই স্বস্তিতে নেই। মরুভূমির প্রাণীগুলোও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকছে পানিতে। পার্কের গাইড ফার্নেস ক্রিক জানান, এ অবস্থা বেশিদিন থাকলে অধিকাংশ প্রাণীকেই বাঁচানো যাবে না। প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের তাপপ্রবাহের কারণে লাস ভেগাসে চিড়িয়াখানাগুলোর প্রায় অর্ধেক প্রাণীই মরে গিয়েছিলো। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মানুষের সংখ্যা ছিলো ১৭। এবারের আগাম সতর্কতার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো এতো বেশি হবে না। তবে গত সপ্তাহে অ্যারিজোনায় দাবানল নেভাতে গিয়ে ১৯ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী মারা গেছে।