ভারতে আত্মহত্যা আইন অপব্যবহার হচ্ছে?
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২০:৪২
গতবছর ভারতে ১৩ হাজারেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। এদের বেশির ভাগেরই মাথার উপর ছিল ভারি ঋণের বোঝা। বিভিন্ন ব্যাংক, মাইক্রো ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তারা শস্য উত্পাদনে ব্যর্থ হয়। ঋণের অর্থও ফেরত দিতে পারছিল না তারা। ১৯৯৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতে তিন লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন- যা ভারতের জন্য লজ্জাজনক ও বিরাট জাতীয় শোকের ঘটনা। প্রশ্ন হচ্ছে, ঋণদাতারা কি আইনগতভাবে এই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনায় সহযোগিতার জন্য অভিযুক্ত হতে পারেন? ভারতীয় আইন অনুযায়ী এর উত্তর হ্যাঁ। দেশটির ১৫৩ বছরের পুরনো দণ্ডবিধি অনুযায়ী আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীর ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী বান্ধবী জিয়া খানকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে সুরজ পাঞ্চোলিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে অবশ্য তাকে জামিন দেয় আদালত। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের সারদা গ্রুপের কর্ণধার সুদিপ্ত সেন হাজার হাজার আমানতকারীর সঙ্গে প্রতারণা করে। এতে হতাশাগ্রস্ত এক আমানকতারী আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় সুদিপ্ত সেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। জিয়া খানের মা সুরজ পাঞ্চোলির বিরুদ্ধে তার মেয়ের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। এর ফলে সুরজ পাঞ্চোলিকে গতমাসে পুলিশ গ্রেফতার করে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা সুরজের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ তুলছে। জেলও খাটতে হয়েছে তাকে। পরে গত সোমবার সুরজ পাঞ্চোলিকে আদালত জামিন দিয়েছে। ওই মামলায় বিচারক বলেন, বান্ধবীর আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার উদ্দেশ্য তার ছিল বলে মনে হয় না। গত মঙ্গলবার ভারতীয় একটি পত্রিকায় একই ধরনের একটি সংবাদ এসেছে। মুম্বাইয়ে এক ফিল্ম এডিটরের সাবেক বয়ফ্রেন্ডকে গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে ওই ফিল্ড এডিটরকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবারই বলেছে,আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে এটা প্রমাণ করতে হবে যে তিনি আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনাকারী ছিলেন অথবা ওই অপরাধ করার একটি স্পষ্ট প্রয়াস ছিল তার। কিন্তু এটা প্রমাণ করা সহজ নয়। ভারতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কে টি এস টুলসি বলেন, এটা এমন নয় যে বন্দুক কিংবা বিষের বোতল দেখিয়ে বলা হলো যাও মরো। এই কারণে আত্মহত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত প্রমাণ করা খুব কঠিন। তাই আশ্চর্যজনকভাবে ভারতে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের শাস্তির হার খুবই কম। এক থেকে দুই শতাংশ।
গতবছরে ভারতে এক লাখ ৩৫ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে মহিলাদের চেয়ে পুরুষ ছিল বেশি এবং এদের অধিকাংশই বিবাহিত। আইনজীবী কে টি এস তুলসি অভিযোগ করেন, পুলিশ আইনটির অপব্যবহার করছে। আইনে প্ররোচনাকারীর স্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের পুলিশ আইনের স্পষ্ট সংজ্ঞা বুঝতে অক্ষম। এর ফল হচ্ছে মানুষের ভোগান্তি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারতের এখনো এই আইনটি প্রয়োজন। কারণ এখনো দেশের অনেক মহিলা যৌতুকের কারণে প্রতিবছর জীবন দেন। জাতীয় অপরাধ বিবরণ ব্যুরোর মতে, যৌতুকের কারণে গতবছর ৮ হাজার মহিলা আত্মহত্যা করেছেন। তিন ভাগের এক ভাগ অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, যৌতুকের কারণে আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলেও অনেকে পার পেয়ে যান। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।