[ নি র্বা চ ন ]
গাজীপুর নির্বাচন কী বার্তা দিয়ে গেল
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২১:৪২
মানুষ যখন নির্ভরযোগ্য লোকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। জনগণ সুযোগ পেলে তা প্রকাশ ঘটাতে দ্বিধা করে না। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ইস্যুতে এখন জনগণ সরকারের প্রতি আস্থাহীন ও ভরসাহীন। গণজাগরণ মঞ্চের কতিপয় ব্লগার ধর্ম নিয়ে ঔদ্বত্য দেখিয়েছে। অথচ সরকার তাদের সমর্থন দিয়েই গেছে। তা সাধারণ মানুষের মনে অনেক রেখাপাত করেছে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও সরকার যে খেলা খেলেছে এবং দুর্নীতিকে জাতীয়ভাবে মোকাবিলার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গড়ে তোলার গণআকাঙ্ক্ষা রয়েছে জাতির নিকট। সেই গণপ্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায়ও জনগণ সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ।
ক্ষমতাসীন মহাজোট আমলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে একের পর এক পরাজয় বরণ করতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এ পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করা দরকার সতর্কতার সঙ্গে। সরকারি দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ চরম পর্যায়ে, নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষের আস্তিক ও নাস্তিক প্রচারণাও এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর হয়েছে। এই ধর্মভিত্তিক প্রচারণারও যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকার পরিচালনায় নানা ধরনের ব্যর্থতা ও জনপ্রিয়তা হ্রাস। কেন্দ্র থেকে জেলা এমনকি উপজেলা পর্যন্ত সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিরোধ। পারস্পরিক অসহযোগিতা ও অসংগঠিত অবস্থা তাদের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বিগত সাড়ে চার বছরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনের ফলাফলই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে গিয়েছে। পৌরসভা নির্বাচন হয়েছে মোট ২৩৯টির। এর মধ্যে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন ৯১ জন, আর বিএনপি প্রার্থী জিতেছেন ৯৬ জন। সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে ৮টিতে। এর সবকটিতে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীগণ। এরমধ্যে ৬টি বিএনপি এবং ২টি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এমপির মৃত্যুর কারণে কয়েকটি উপ-নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে দুইটিতে অংশ নিয়েছে বিএনপি। এই দুইটির মধ্যে একটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। অন্য উপ-নির্বাচনগুলোতে বিএনপি অংশ নেয়নি। আর চার হাজার ২৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দুই হাজার ১৯৭টিতেই হেরেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬২টিতেই বিজয়ী হয়েছিলো। এর ২৪ দিন পরই অনুষ্ঠিত ৪৭৫টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য বজায় রেখে ৩০৪টিতে জয়ী হয়। এর পর যতই দিন যেতে থাকে, আওয়ামী লীগের পরিণতি পরাজয়ের দিকে ধাবিত হতে থাকে। এ পরাজয়ের বিপক্ষের যুক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ সব সময়ই বলেছে :গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব তা প্রমাণ হয়েছে, জনগণের রায়কে দল মেনে নিয়েছে, এটা স্থানীয় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন না। এতে জাতীয় রাজনীতির ওপর প্রভাব পড়ে না। আবার দলের দুর্বলতার কারণে নির্বাচনে পরাজয়ের কথা স্বীকার করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও তুলছেন কেউ কেউ। প্রবীণ নেতাদের মতে, দলের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা নেতারা সংগঠন গোছানো, সংগঠনে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সঠিক দায়িত্ব পালনে বিগত সাড়ে চার বছরে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
ক্ষমতাসীন হওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রথম পরাজয়ের সূচনা হয়। ২০১০ সালের ১৭ জুন অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থী এম মঞ্জুর আলম মঞ্জুর নিকট। ৯৫ হাজার ৫২৮ ভোটের বিশাল ব্যবধানে মঞ্জুর হারিয়ে দেন তারই রাজনৈতিক গুরু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। চট্টগ্রাম নির্বাচনে দল মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সমর্থন দিলেও তার পক্ষে মাঠে নামেননি স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাগণ। আওয়ামী লীগের পরাজয় আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনসমূহে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার গঠন করেও আওয়ামী লীগ দুই বছরের মাথায় নির্বাচনের রাজনীতিতে এসে হোঁচট খেয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পিছিয়ে পড়ে জাতীয় নির্বাচনেও ভরাডুবি হয় বিএনপির কাছে। পৌরসভা নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ২১ জন বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। সে সময়ে দলের অভিজ্ঞ নেতাদের বিশ্লেষণে চিহ্নিত হয়েছিল পরাজয়ের নানা কারণ। বিশেষত দলে ভুল প্রার্থী মনোনয়ন দান, দলীয় কোন্দল এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের অদক্ষতা ও সরকারের জনপ্রিয়তা ঘাটতির কারণে পৌরসভা নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল লাভ করেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। পৌরসভার রেশ না কাটতেই শাসক দল আবারও পরাজিত হয় হবিগঞ্জ-১ উপ-নির্বাচনে। দলের প্রবীণ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুর পর শূন্য হওয়া সংসদীয় আসনটিতে জয় ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগ। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয় হয়েছিল। তারপর নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের প্রার্থী পদ নিয়ে দেখা দেয় বিরোধ। এ নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমান লক্ষাধিক ভোটে পরাজিত হন বিদ্রোহী প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভীর নিকট। ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নবগঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও পরাজিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। দলের দুই বিদ্রোহী প্রার্থীকে নির্বাচনের মাঠ থেকে নিষ্ক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে নির্বাচনে বিএনপি থেকে অব্যাহতি পাওয়া সম্মিলিত নাগরিক কমিটির নেতা মনিরুল হক সাক্কু সহজ জয় পান। এছাড়া গত ২০১১ সালের ৩১ মে থেকে শুরু হয়ে ৫ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে বিএনপি। ইউপি নির্বাচনে প্রায় প্রত্যেক জায়গায় ছিল আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী। মোট ৪২৯৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ২১০১, বিএনপি সমর্থিত ১৬১৮, জাতীয় পার্টি সমর্থিত ৮৪ জন প্রার্থী জয় লাভ করে। এ নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে থাকলেও তাদের ভোট ব্যাংকে আঘাত করে বিরোধী দল বিএনপি। চলতি বছর অনুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয় লাভ করে। এবছর ১৫ জুন খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজিত হয়। এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার ধস দলের ভেতরে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তোলে।
এবার গাজীপুর সিটি নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকে গুলশানের বাসভবনে বসেই নির্বাচন সংক্রান্ত খোঁজ নেন বেগম জিয়া। তিনি গণমাধ্যম, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মাধ্যমে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের খবরা-খবর রাখেন। এছাড়া গুলশান অফিসের কর্মকর্তাগণ বেগম জিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠিয়েছেন। কোনো নির্দেশনা থাকলে সাথে সাথে নেতাদের তা জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। এছাড়া ভোটগ্রহণ শেষে বাসায় টেলিভিশনের সহায়তায় ভোটের ধারাবাহিক ফলাফল প্রত্যক্ষ করেন তিনি। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ব্যাপারে লন্ডনে চিকিত্সাধীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য তারেক রহমানেরও আগ্রহের কমতি ছিল না। তিনি তার বিশ্বস্ত নেতাদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিয়েছেন নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন চলাকালে নানা শঙ্কা থেকে গাজীপুর সীমানা ঘেঁষে থাকা জেলা নেতারা দিনভর অবস্থান নিয়েছিলেন। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজধানীর উত্তরা এবং ঢাকা জেলার নেতারা সাভার এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল সতর্ক অবস্থায় প্রস্তুত ছিল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান, ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির যুগ্ম মহাসচিবসহ সারাদিন ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা সতর্ক অবস্থায় ছিলেন গাজীপুরের আশপাশে। ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তাদের যার যে দায়িত্ব তা পালন করেছেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘন্টা আগে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সংবাদ সম্মেলনে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেউই ভোট কেন্দ্র ছেড়ে যাবেন না।”
স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃবৃন্দের তদারকি এবং নির্দলীয় প্রার্থীদের উপর দলীয় প্রচারণা ও চ্যালেঞ্জকে জাতীয় নির্বাচনমুখী উদ্যোগ বলে বিশ্লেষণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের ফলাফলের পর বেগম খালেদা জিয়া দলীয় নেতা ও কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, উত্ফুল্ল না হয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠক করে বলেছেন : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও দলীয় সরকারের অধীনে সংবিধানসম্মত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে গণতন্ত্রের প্রতি তার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকিবউদ্দিন আহমেদ বলেছেন: নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে, ফলাফল মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গঠন করুন। তার এ বক্তব্যের মর্মার্থ উপলব্ধি করা উচিত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের।
গাজীপুর নির্বাচনের প্রতিক্রিয়ায় যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “জনগণের কাছে দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে কিছু নেই। জনগণ যে-কোন দুর্গই ভেঙে দিতে পারে, যদি তারা আস্থা হারায়।” গাজীপুর নির্বাচন স্থানীয় পর্যায়ের হলেও এ থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রসর হতে হবে। এ নির্বাচন সরকারের জন্য অবশ্যই বার্তাবহ। এ নির্বাচন সরকারকে কী সতর্কবার্তা দিয়ে গেল তা নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে সরকারকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
ratantanukc@yahoo.com
www.agrosorbd.blogspot.com