অসংসদীয় ভাষা প্রয়োগে নেতাদের সম্মান বাড়ে না

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় সংসদ সদস্যদের কয়েক জনের অসংসদীয় বক্তব্য শুনে অনেকেই স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। তাদের বক্তব্য শুনে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তারা আসলে জনগণের কোন অংশের প্রতিনিধি! যে দেশে সাধারণ জনগণ শ্রদ্ধা, লজ্জা, শালীনতা, বিনয় ইত্যাদি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সযত্নে ধারণ ও লালন করেন সেই দেশে তাদেরই প্রতিনিধিরা কিভাবে ভাষা ব্যবহারে এতটা অসাবধানী হতে পারেন। সংসদ অধিবেশন চলাকালে মিনিটে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। এ টাকা জনগণের। জনগণের টাকা খরচ করে জনপ্রতিনিধিগণ সংসদে জনসংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বিপরীতে গিয়ে কার্যত জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সংসদকে আমরা ‘মহান’ বলে থাকি। এখানেই দেশের সংবিধান রচিত হয়; আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত এক্তিয়ার সংসদের। দেশের হূদপিণ্ড ও মস্তিষ্ক উভয়ের ভূমিকায়ই সংসদ অধিষ্ঠিত। সংসদে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় নেতৃবৃন্দের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। এ চরিত্র হননের মধ্য দিয়ে মূলত জাতিকে নেতৃত্বের দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন তারা। জাতীয় নেতাদের একজনকে আরেকজনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তারা। যারা বক্তব্য দিচ্ছেন তারা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুবা জিয়াউর রহমানের অনুসারী বলে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা জিয়াউর রহমান কি কখনো কোন বক্তৃতায় অশালীন শব্দ উচ্চারণ করেছেন? তারা কি প্রতিপক্ষ ছিলেন? প্রতিপক্ষ থাকলে জিয়াউর রহমান ’৭১-এ কালুরঘাট বেতার থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানকালে বঙ্গবন্ধুর নামে তা করতেন না। অনুরূপভাবে শত্রুতা থাকলে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ শেষে জিয়াউর রহমানকে বীর উত্তম পদবী দিতেন না এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সেনাবাহিনীতে যিনি মেজর পদমর্যাদায় ছিলেন তাকে স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদে নিয়োগ দিতেন না। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সংসদে সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক, ভাসানীর সাথে বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দিয়ে আইন পাস করতেন না এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দিতেন না। এসবই ঐতিহাসিক সত্য। বিবেকবান মানুষ এ সত্যকে ধারণ করে উভয় নেতার ভূমিকাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন এবং এদের নিয়ে গর্ববোধ করেন। এ অবস্থায় যারা এদের দুজনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে গালিগালাজের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন, তাদের ভূমিকা সত্যিই হতাশাজনক। এর মধ্য দিয়ে তারা দেশের সুন্দর সংস্কৃতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আমরা জানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশ ও সমাজের ‘সম্পদ’। শাসন-প্রশাসন এবং পরিবর্তনে এদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ বিকাশের মতো নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও পরম্পরা আছে। কোন নেতাই হঠাত্ করে বিচ্ছিন্নভাবে আবির্ভূত হন না। কোন সমাজের প্রেক্ষাপটে সে সমাজের নেতাদের পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির শুরু হয় পলাশীর যুদ্ধের পর। এর আগে জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ এবং গণমুখীনতা ও গণসম্পৃক্তির বিষয় রাজনীতি ছিলো না। ছিল শুধু প্রাসাদনির্ভর রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা বদলের কার্যক্রম। ফলে পলাশীউত্তর সময়ে যারা মূলধারার রাজনীতি করেছেন বা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই জাতীয় চেতনা সমুন্নত ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবশ্য ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক প্রতিপালিত কিছু ব্যক্তিত্বকে রাজনীতিতে ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তবে তারা ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। পলাশীউত্তর সময় থেকে শুরু করে একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই মূলধারাই কার্যকর ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান এ ধারারই উত্তরাধিকার বহন করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের ও দেশের মুক্তি চেয়েছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে, বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন ও জীবনের দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়েছেন। তিনি জাতিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত মুক্তি সংগ্রামে সম্পৃক্ত করেছেন। যার ফলাফল হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং রাজনীতিতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার অভ্যুদয় ’৭১-এ কালুরঘাট বেতার থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। উপস্থিতি যত আকস্মিকই হোক না কেন জিয়াউর রহমানের অভ্যুদয় হয়েছে বাংলাদেশের শত শত বছর পূর্বেকার রাজনীতির উত্তরাধিকার নিয়েই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের পর বাংলাদেশের সনাতন মূলধারার রাজনীতি ম্লান হয়ে যায় এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বে স্বাধীনতা, গণমুখীনতা ও দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার খোলা চোখে তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। ব্যক্তি তোষণ ও ব্যক্তি অনুকম্পা লাভই সরকারি ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সনাতন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও ধরন পাল্টে গেছে। আগে নেতা ছিল, নেতার আদর্শের অনুগামী বা অনুসারী ছিল। অনুসারীদের মধ্য থেকে নিজ যোগ্যতায় নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হতো। কিন্তু হতাশাজনক শোনালেও সত্য এখন বিকাশের এ পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। যোগ্যতা, দক্ষতা, জনসমর্থন ও নির্বাচনের মাধ্যমে যদি দল চলতো তাহলে গালাগালির সংস্কৃতি চালু হতো না। নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য তারা শুধু তাদের নেতার গুণগান করেই ক্ষান্ত থাকছেন না, উপরন্তু প্রতিপক্ষের নেতার কুত্সা ও চরিত্র হনন করতে খুবই আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বিপক্ষ দলের নেতা-নেত্রীদের প্রকাশ্যে তাচ্ছিল্য করতে না শিখলে প্রকৃত সমর্থক বা কর্মী হওয়া যায় না। এর ফলে দেশে রাজনীতি ক্রমাগতই অসুস্থ ও রুচিহীন হয়ে পড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না। তবু আশার কথা, সংসদের সকল সদস্য ভাষা ব্যবহারে এতটা ‘নিষ্ঠুর’ হন না। অনেকে বিব্রত হয়ে স্পিকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যারা অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন তাদের শাস্তির দাবি করেছেন, জরিমানা আরোপের বিধান চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের এই ভূমিকা কিছুটা হলেও জনগণকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু ‘তৈলমর্দন’কে যদি নেতা হবার ‘গুণের’ তালিকা থেকে বাদ না দেয়া যায় তবে যতই আইন করা হোক না কেন, ফল হবে না। নেতৃত্ব অর্পণের বিষয় নয় বরং অর্জনের বিষয়। ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতৃত্ব গণআস্থা লাভ করতে পারে না। এজন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৃণমূল থেকে নেতৃত্বের বিকাশ হওয়া দরকার। তেমনটি হলে অনেক দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব রাজনীতিতে আসবেন এবং নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ পাবেন। অসংসদীয় ভাষা ঠাঁই পাবে না কারো মুখে। লেখক:অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় Email: akafirowzahmad@gmail.com