দেশের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে শ্রমিকরা প্রতারণার শিকার
মো. শাহাজাহান সাজু, সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৩, ২৩:০০
সিঙ্গাপুরগামী শ্রমিকরা দেশে প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে হর-হামেশা প্রতারিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিঙ্গাপুরে শিপইয়ার্ড ও নির্মাণ কাজে নিয়োজিত প্রতারিত শ্রমিকরা জানান যে, সিঙ্গাপুর সরকার অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার চেয়ে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি প্রধান্য দিয়ে থাকে এবং অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। এই সুবাদে দেশের অনেক বেকার যুবক দক্ষতা অর্জন করে সিঙ্গাপুরে যেতে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে যোগাযোগ কিংবা স্থানীয় দালালদের সাথে পরামর্শ করে ঢাকার মীরপুর, টঙ্গী, তুরাগ থানার বাটুলিয়া, কামারপাড়া, আশুলিয়া, জিরাবো, সাভার, নরসিংদীর পলাশ ও কিশোরগঞ্জের পুলেরঘাট এলাকায় গড়ে উঠা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হয়ে থাকে। বাহারি নামের এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অনেকের লাইসেন্স নেই এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জমাদি ও দক্ষ প্রশিক্ষক কিংবা প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষাকালীন থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা নেই। এরপরও এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মালিকগণ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কেউ ভর্তি হতে এলে আগেই মূল পাসপোর্ট এবং মোটা অংকের টাকা অগ্রিম হিসেবে জমা দিতে হয়। যদি কোন কারণে নির্দিষ্ট সময়ে প্রশিক্ষণ নিতে কেউ ব্যর্থ হয়, তবে তার জমাকৃত টাকা আর ফেরত দেয়া হয় না। শুধু তাই নয়, আগেই তার সাথে যাবতীয় চুক্তি সম্পন্ন করা হয় বিভিন্ন কৌশলে। অভিযোগ মতে, এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষতার সার্টিফিকেট আলাদাভাবে প্রশিক্ষণার্থীকে দেয়া হয় না। কেন্দ্রের পছন্দমত কোম্পানির কাজে সিঙ্গাপুর যেতে রাজী হলেই কেবল তাকে কেন্দ্রে নাম নিবন্ধনের সুযোগ দেয়া হয়। যদি কেউ পাস করার পর নিজের আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক খুঁজে নেয়া একটি ভালো কোম্পানিতে অধিক বেতনে কাজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে তাহলে তাকে চুক্তির পুরো টাকা প্রদান করতে হয়। নতুবা তার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়। ফলে ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে অন্য কোন কোম্পানিতে যেতে পারে না। কিংবা গেলেও সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা দিতে হয়। ৩/৪ মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে কোন কারণে অকৃতকার্য হলে ২ থেকে ৩ মাস অপেক্ষা করে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে আরো অধিক সময় অপেক্ষা করে আবার তাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এছাড়া দক্ষতা মল্যায়ন পরীক্ষা দেয়ার পর সার্টিফিকেট পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অদক্ষ শ্রমিকদের বেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে। সিঙ্গাপুর থেকে ডেলিগেট আনার নাম করে ডেলিগেট আসার আগ পর্যন্ত নামকা ওয়াস্তে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। অথচ সিঙ্গাপুরে কাজ করার জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ শ্রমিকরা নিত্য-নৈমিত্তিক কাজেই রপ্ত করতে পারেন। তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অবস্থান করে প্রাথমিক মৌলিক ধারণার প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করা হয়। ৫/৬ দিন থাকা-খাওয়া আর প্রশিক্ষণ বাবদ জনপ্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা আদায় করে থাকে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। শেষে সেই কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেয়া ২ থেকে আড়াইশ শ্রমিক থেকে বাছাই করে ৩৫ জনকে নির্বাচিত করে এবং বিভিন্ন অজুহাতে অন্যদের অকৃতকার্য কিংবা অযোগ্য বিবেচনায় ডেলিগেট কর্তৃক বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়; কিন্তু শ্রমিকদের আগে প্রদানকৃত টাকা আর ফিরিয়ে দেয়া হয় না। কেন্দ্রগুলো এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। হাতে-গোনা কয়েকটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছাড়া বাকী সব কেন্দ্রে এ ধরনের প্রতারণা চলছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে অনেক শ্রমিক প্রতিশ্রুত কাজ ও বেতন-ভাতা না পেয়ে এক বছর পর পারমিট নবায়ন না করায় খালি হাতে দেশে ফিরে আসে। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে ১ লাখ ২৩ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। তার মধ্যে অধিকাংশ শ্রমিকই সেখানে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। ভুক্তভোগী শ্রমিকরা সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতারণায় জড়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সীজের (বায়রা) সভাপতি শাহজালাল মজুমদার মোবাইল ফোনে গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমিকদের আনীত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে আমি অবগত নই। তবে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সংগঠনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।