বগুড়া শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা

দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকেন এমন ব্যক্তি বগুড়ায় এলে যে কথাটি প্রায় সবাই বলেন তা হচ্ছে কর্মব্যসত্মতা ও প্রাণচাঞ্চল্যে বগুড়া শহরকে ঢাকা মহানগরীর মত মনে হয়। প্রায় চার লক্ষ নাগরিক অধ্যুষিত এই শহর সদা প্রাণের স্পন্দনে জমজমাট। বগুড়া শহরের বিভিন্ন উপজেলার অধিবাসীরা তো বটেই বগুড়া জেলার আশে পাশের জেলা যেমন জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ জেলার অনেক অধিবাসী বগুড়া শহরে জায়গা কিনে বা ফ্ল্যাট কিনে স্থায়ী হচ্ছেন। দ্রম্নত বর্ধিষ্ণু এই শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা বিভিন্ন কারনে নগরায়ণের ব্যাপ্তি ও গভীরতার সঙ্গে তাল মিলাতে পারে নি। এর কতিপয় কারণ ও ব্যাখ্যা নিম্নে আলোচনা করা হলো ঃ ১। বর্তমান বগুড়া শহরের প্রাণ কেন্দ্র একটি পুরাতন শহর যার রাসত্মা গুলো খুবই অপ্রশসত্ম। দুইটি প্রশসত্ম বাইপাস সড়ক শহরকে বেষ্টন করেছে বটে কিন্তু শহরের অভ্যন্ত্মরে মোটামুটি প্রশসত্ম রাসত্মা মাত্র দুইটি ঃ একটি বনানী মোড় থেকে সাতমাথা হয়ে মাটিডালি মোড় পর্যন্ত্ম এবং অন্যটি সাতমাথা থেকে তিনমাথা পর্যন্ত্ম। অন্য সকল রাসত্মা দিয়ে দুইটি বড় বা মাঝারি যানবাহন পরস্পরকে অনেক কষ্টে কোনমতে অতিক্রম করতে পারে। ২। বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা একসময় ছিল শহরের সবচাইতে অভিজাত আবাসিক এলাকা। কালক্রমে এটা হয়ে উঠেছে ব্যতসত্মম অভিজাত শপিং এলাকা। উচ্চবিত্ত ব্যক্তিরা কেনাকাটা করতে প্রায়শই জলেশ্বরীতলা আসেন। আরো আসেন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা। বগুড়ায় উচ্চবিত্তেরা প্রায়শঃ নিজস্ব গাড়ী ব্যবহার করেন। সরকারী কর্মকর্তারা গাড়ীতে আসেন। মার্কেটসমূহে কোন পার্কিং এর ব্যবস্থা না থাকায় জলেশ্বরীতলায় আগত গাড়ীসমূহে অবধারিতভাবে রাসত্মায় পার্ক করা হয়। এছাড়া কয়েকটি বিখ্যাত কোচিং সেন্টার জলেশ্বরীতলা এলাকায় অবস্থিত। কোচিং সেন্টারে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের অনেকে গাড়িতে আসে। কোচিং এবং শপিং দুয়ে মিলে জলেশ্বরীতলা সবসময় অত্যন্ত্ম ব্যসত্ম থাকে। ৩। ভৌগোলিকভবে যেমন মাঝখানে তেমনি গুরম্নত্বের দিক থেকে উত্তরাঞ্চলের শীর্ষে রয়েছে বগুড়া। প্রায় সকল পণ্যের বিতরণ প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক অফিস ও ডিপোর অবস্থান শহরের অভ্যন্ত্মরে ব্যসত্ম এলাকায়। ডিপোতে মালামাল লোড-আনলোড হয় বড় ট্রাক, ছোট পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহনে। দিনের বেলা ট্রাক শহরে প্রবেশ নিষেধ কিন্তু রাতে প্রবেশ করা ট্রাক থেকে মালামাল আনলোড করতে করতে দিনের ব্যসত্ম সময় শুরম্ন হয়ে যায়। আর বলার অপেক্ষা রাখে না প্রায় সব ক্ষেত্রে মালামাল লোড আনলোড হয় ট্রাক রাসত্মার উপর দাঁড় করিয়ে। এছাড়া রয়েছে অনেকগুলো ট্রান্সপোর্ট এজেন্সী যাদের অফিস ও গোডাউন একস্থানে এবং অধিকাংশের অবস্থান শহরের ব্যসত্ম এলাকায়। ৪। বগুড়া শহরের কোন টাউন সার্ভিস পরিবহন ব্যবস্থা নাই। যেমন বনানী মোড় থেকে তিনমাথা চারমাথা মাটিরডালি এসব দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার জন্য কোন বাস নেই। অথবা একটানা যাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। যে কারনে সিএনজি অটোরিক্সা ব্যাটারিচালিত অটো এসবের ব্যবহার বেশী। এসব স্থানেও আবার ভেঙ্গে যেতে হয় যেমন বনানী হতে সাতমাথার কাছাকাছি ইয়াকুবিয়া মোড় পর্যন্ত্ম সিএনজি অটোরিক্সায় তারপর রিক্সায় দত্তবাড়ী আবার সিএনজি অটোরিক্সায় মাটিডালি এরকম ভাবে যেতে হয়। ৫। বগুড়া শহরে রিক্সা বেড়ে চলেছে নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে। বাড়ছে সিএনজি অটোরিক্সা, ব্যাটারীচালিত বাহন এবং মানুষের আর্থিক সচ্ছলতার সাথে সাথে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের সংখ্যা। ৬। বগুড়া শহরে হাউজিং ব্যবসা দ্রম্নত বাড়ছে। গড়ে উঠছে অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। এছাড়া গড়ে উঠেছে অনেক বহুতল শপিং সেন্টার। পরিতাপের বিষয় এসব আপার্টমেন্ট বিল্ডিং বা শপিং সেন্টারের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফলে গাড়ি পার্কিং হয় রাসত্মায়। ৭। বগুড়ার আন্ত্মঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে চারমাথায় অবস্থিত। এই টার্মিনালে যাওয়া-আসার জন্য ভালো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। এছাড়াও ঠনঠনিয়াতে আছে ঢাকা বাস টার্মিনাল। অনেক পূর্বের বগুড়ার ড়্গেত্রে ঠনঠনিয়া ছিল শহরের অনেকটা বাইরে। কিন্তু বর্তমান শহরের বিবেচনায় ঠনঠনিয়া অনেকটাই মূল শহরের মধ্যে পড়ে। তাই ঠনঠনিয়ায় ঢাকার বাস যাওয়া আসা ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করে। ৮। বগুড়া শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা সাতমাথা কেন্দ্রিক। সাতমাথার উত্তর-দড়্গিণ বা পূর্ব-পশ্চিম এক অংশ হতে অন্য অংশে যেতে সাতমাথা অতিক্রম করতে হয়। এতে সাতমাথার উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। এছাড়া সাতমাথায় বেশ কয়েকটি দূরপালস্নার বাস সার্ভিসের কাউন্টার আছে। এসব কাউন্টারের সামনে বাস দাঁড়িয়ে থাকে। ৯। বগুড়া নিউমার্কেট কোন একক মার্কেট নয়। পাশাপাশি গড়ে উঠা প্রায় পঞ্চাশের অধিক মার্কেট একত্রে নিউ মার্কেট নামে পরিচিত। এর অবস্থান সাতমাথার খুব নিকটে। সকল শ্রেণীর মানুষের প্রধান কেনাকাটার স্থান নিউ মার্কেট। নিউ মার্কেটে দোকানের ঘনত্ব অনেক বেশী কিন্তু নিউ মার্কেট প্রবেশের মূল পথ ব্যসত্মতম সড়ক কবি নজরম্নল ইসলাম সংলগ্ন। এছাড়া অন্যদিকে তেমন কোন প্রবেশ পথ নেই। পিছনের দিকে প্রবেশ পথ তেমন ব্যবহার হয় না। ফলে নিউ মার্কেটে আগত মানুষ ও যানবাহনের চাপে কবি নজরম্নল ইসলাম সড়কের সাতমাথা থেকে দত্তবাড়ী পর্যন্ত্ম অত্যন্ত্ম ব্যসত্ম থাকে। ১০। বগুড়া শহরের ব্যসত্মতম সড়ক কবি নজরম্নল ইসলাম সড়ক। এই সড়কে অবস্থিত নিউ মার্কেটের অদূরে রেলওয়ের একটি লেভেল-ক্রসিং আছে। এমনিতেই যেকোন লেভেল-ক্রসিং ট্রাফিক প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে তার উপর উলেস্নখিত লেভেল-ক্রসিংটির বিশেষত্ব হচ্ছে এটি নিয়ন্ত্রন করা হয় বনারপাড়া হতে। ফলে প্রায়শঃ দেখা যায় ট্রেন আসার প্রায় ২০ মিনিট আগেই লেভেল ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুই দিকে সৃষ্টি হয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রন করা হলে এই লেভেল ক্রসিং বন্ধের সময় যৌক্তিকভাবে ৫ মিনিটে নামিয়ে আনা সম্ভব। আর ভবিষ্যতে মোটরযানের জন্য ওভারপাস বা Ramp তৈরী করলে ট্রাফিক প্রবাহ অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব। ১১। শিড়্গা নগরী হিসাবে বগুড়া এখন সুপ্রসিদ্ধ। অনেক ভালো স্কুল-কলেজ রয়েছে বগুড়ায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও প্রয়োজনের তাগিদে এসব স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী পরিবহনের জন্য নিজস্ব বাস আছে। সমস্যা হচ্ছে এসব বড় বড় বাসকে ছাত্র-ছাত্রীদের বাসার কাছাকাছি যেতে হয় সরম্ন রাসত্মা দিয়ে যা প্রায়ই যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১২। সিএনজি অটোরিক্সা খুব দ্রম্নত বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যে এ সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। শহরের ভিতরে এবং শহর হতে শহরতলী ও নিকটবর্তী থানাসমূহে যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিক্সা খুব জনপ্রিয় বাহন। অথচ শহরের ভিতরে বা শহর সীমানা কোথাও কোন সিএনজি অটোরিক্সার কোন স্ট্যান্ড নেই। স্ট্যান্ড বলতে এখন যা আছে তা হচ্ছে রাসত্মার উপরে অনেক সিএনজি অটোরিক্সা একত্রে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করানো। স্ট্যান্ড হতে হবে রাসত্মার পাশে রাসত্মার উপর নয়। ১৩। আবাসিক ও বানিজ্যিক চাহিদার কারণে বগুড়া শহরে অনবরত নতুন নতুন বিল্ডিং নির্মাণ হচ্ছে যার বেশিরভাগই বহুতল। অনেক ড়্গেত্রে দেখা যায় বিল্ডিং নির্মাণের সামগ্রী রাখা হয় রাসত্মার উপরে। এটা করা হয় অসচেতনতার কারণে অথবা কখনো খরচ বাচানোর জন্য কিন্তু রাসত্মার উপরে নির্মাণ সামগ্রী রাখায় ট্রাফিক প্রবাহ বাধাগ্রসত্ম হয়। যানজটমুক্ত শহর শহরবাসীর প্রানের দাবী। যেকোন আলোচনায় প্রথমেই উঠে আসে যানজটের ভোগান্ত্মির প্রসঙ্গ। যানজটে শারীরিক কষ্ট যেমন হয় তেমনি নষ্ট হয় মূল্যবান শ্রমঘন্টা। একটি শহরকে যানজটমুক্ত রাখার জন্য দরকার একটি সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার তিনটি প্রধান দিক হলো ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্রাফিক এনভাইরনমেন্ট এবং ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট। ট্রাফিক প্রবাহের গতিবৃদ্ধি, ইন্টারসেকশনে ন্যূনতম সময় ব্যয় এবং সকল প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মূল লড়্গ্য। পূর্বে আলোচিত কিছু বিষয় ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর আওতায় পড়ে যেমন প্রশসত্ম এবং ব্যবহার উপযোগী রাসত্মা, ইন্টারসেকশন, ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট, রোডমার্ক, ট্রাফিক সাইন স্থাপন ইত্যাদি। বগুড়া শহরের অধিকাংশ রাসত্মা প্রশসত্ম নয় এবং দু’পাশের বাড়ীঘর দোকানপাট সরিয়ে রাসত্মা প্রশসত্ম করা সহসাই সম্ভব নয়। কেননা এর সাথে বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় জড়িয়ে আছে। শহরের অভ্যন্ত্মরের ইন্টারসেকশনসমূহ ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং দৃষ্টিকোন থেকে ডানে মোড়-বামে মোড়-সমুখে গমন সহজ ও দ্রম্নত করার উপযুক্ত করে তৈরী হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও অর্থায়ন হলে এটা সহজেই করা সম্ভব। ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর অন্যান্য বিষয়গুলো এই মুহুর্তে কম গুরম্নত্বপূর্ন হলেও অদূর ভবিষ্যতে এগুলোর উন্নয়ন প্রয়োজন হবে। ভৌত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ট্রাফিক এনভায়রনমেন্ট ও ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট এর উন্নয়ন করে একটি কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ট্রাফিক বিভাগ। বগুড়া জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ নিরলস ভাবে সে লড়্গ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ভৌত অবকাঠামোর সীমাসদ্ধতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে বগুড়া শহরের ট্রাফিক সচল রাখা অত্যন্ত্ম কঠিন। এছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ট্রাফিক আইন মেনে চলতে অভ্যসত্ম নয়। এ অবস্থায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা রড়্গা করতে না পারলে গোটা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। ট্রাফিক বিভাগ তিনটি উপায়ে ট্রাফিক শৃঙ্খলা রড়্গার জন্য কাজ করে ঃ সচেতনতা সৃষ্টি, শৃঙ্খলা রড়্গায় বাধ্য করা এবং মোটরযান আইনে মামলা ও জরিমনা আদায়ের মাধ্যমে। নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে সীমিত জনবল দিয়ে ট্রাফিক বিভাগ বগুড়া শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে সফল হয়েছে।