পালাক্রমে ধর্ষণের বর্ণনা দিল চালক নুরুজ্জামান

 ‘আমার খালাতো ভাই বোরহান পথের মধ্যে বাসটিতে ওঠে। দ্বিতীয় সিটে বসা ছিল তানিয়া। হেলপার লালন এ সময় টেনেহেঁচড়ে বাসের মাঝখানে নিয়ে যায় তানিয়াকে। কিছুক্ষণ পর আমি লালনকে বাস চালাতে বলি। তখন তানিয়াকে চেপে ধরে রেখেছিল বোরহান। পেছনের সিটে বলে আমি কিছুক্ষণ সিগারেট খাই। ততক্ষণে টেনে হিঁচড়ে তানিয়ার কাপড় খুলে ফেলে বোরহান। এরপর প্রথমে আমি তাকে ধর্ষণ করি। তারপর আমি বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসলে লালন, এরপর বোরহান পালাক্রমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে তানিয়া লালনকে লাথি মারে। শক্ত একটি রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে। এতে তানিয়ার মাথা ফেঁটে যায়। এরপর আমরা তিনজন মিলে বাস থেকে জোরে ধাক্কা দিলে তানিয়া নিচে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার সময় বাসের সঙ্গে মাথায় বাড়িও খায়।’ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার এমন রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বাসের চালক নূরুজ্জামান। 

গত শনিবার রাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে স্বর্ণলতা পরিবহনের ড্রাইভার নূরুজ্জামান নূরুকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে রাতেই তাকে জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়। চলন্ত বাসে নার্স শাহিনূর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা অকপটে স্বীকার করেন তিনি।

গতকাল রবিবার বিকালে পুলিশ সুপারের কনফারেন্স রুমে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ব্রিফিং করেন। তিনি জানান, ড্রাইভার নূরুজ্জামান, হেলপার লালন মিয়াসহ মোট তিনজন পালাক্রমে তানিয়াকে ধর্ষণ করেছে বলে আদালতে স্বীকার করেছে। জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, তানিয়ার মাথায় আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তার লাশ কিশোরগঞ্জ-ভৈরব সড়কে বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড়-গজারিয়া নামক স্থানে রাস্তার ওপর ফেলে রেখে এটিকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। কিন্তু ঠিক সেইসময় একটি মোটরসাইকেল ও একটি অটোরিকশা রাস্তা অতিক্রম করার সময় চালকরা ঘটনা দেখে ফেলে। তখন বাসের ড্রাইভার ও হেলপার তাদের জানান, মেয়েটি চলতি বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। পরে তারা লাশ পুনরায় বাসে তুলে পিরিজপুর বাজারে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। কিন্তু তানিয়ার শারীরিক অবস্থা দেখে ফার্মেসির মালিক তাকে দ্রুত নিকটস্থ জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। কিন্তু তারা কটিয়াদী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে লাশ ফেলে রেখে কেটে পড়ে।

ডিআইজি জানান, জব্দকৃত আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ধর্ষকদের মধ্যে একজন এখনো পলাতক রয়েছে। পুলিশ তাকে ধরার জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করা হবে বলে তিনি জানান। মামলাটি পুলিশ খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং মামলা দায়েরের আগেই প্রধান দুই আসামিকে গ্রেফতার করতে পুলিশ সক্ষম হয়েছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ঘটনাস্থল বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড়-গজারিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি পিরিজপুর বাজারে যান এবং তানিয়াকে চিকিত্সার জন্য প্রথমে যে ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই সততা ফার্মেসির মালিক হাবীবুর রহমান ও পার্শ্ববর্তী হাওয়া ফার্মেসির মালিক খাইরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন। পরে ডিআইজি বাজিতপুর থানায় যান। সেখানে তিনি নিহত তানিয়ার পিতা মো. গিয়াসউদ্দিন, তার চাচা নাসিরউদ্দিন ও তার চার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় তার সঙ্গে অতিরিক্ত ডিআইজি ও কিশোরগঞ্জের এসপি উপস্থিত ছিলেন।

গত ৬ মে রাতে কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামের শাহিনূর আক্তার তানিয়া ঢাকা থেকে স্বর্ণলতা প্রাইভেট লিমিটেডের একটি বাসে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ব্যাপারে নিহতের পিতা মো. গিয়াসউদ্দিন বাদী হয়ে বাসের ডাইভার, হেলপারসহ মোট ৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনকে আসামি করে বাজিতপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে গ্রেফতার অন্য চার আসামি পুলিশ রিমান্ডে রয়েছে। এরা হলো- বাসের হেলপার লালন মিয়া, রফিকুল ইসলাম রফিক, মো: খোকন মিয়া ও মো: বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংরা বকুল।

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হাবীবুর রহমান জানান, গতকাল রবিবার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তানিয়াকে হত্যার আগে গণধর্ষণ করা হয় ও পরে মাথায় আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় বলে তিনি জানান। এদিকে গতকালও তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে কটিয়াদী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কটিয়াদী ডিগ্রি কলেজ ও চাতল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।