সিলেট এমসি কলেজ

ছাত্রাবাস পোড়ানোর এক বছরেও দোষীরা চিহ্নিত হল না

দীর্ঘ এক বছর অতিবাহিত হলেও এখনো সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পুড়ানোর ঘটনার সাথে জড়িত আসল নায়কদের ধরতে পারেনি পুলিশ। দীর্ঘ ৮ মাস ধরে পুলিশের সিআইডি এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি তদন্ত করছে। কিন্তু কেন এর সুরাহা করতে পারছে না তা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অথচ এই অগ্নিসংযোগের সাথে কারা কারা জড়িত এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সচিত্র রিপোর্টেও প্রকাশ পেয়েছে। এদিকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পোড়ানোর পূর্ণ এক বছর হয়েছে গতকাল সোমবার। এ উপলক্ষে ছাত্রাবাসের ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কলেজ ছাত্রাবাসের প্রধান ফটকে দুপুরে মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধনে অবিলম্বে দায়ীদের গ্রেফতার, ছাত্রদের জন্যে হোস্টেল খুলে দেয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছে। গত বছর ৮ জুলাই এমসি কলেজ মাঠে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের জের ধরে ওইদিন রাত ৯টার দিকে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) এর ছাত্রাবাস। কাঠ ও টিনের সেমিপাকা এই ছাত্রাবাসটি নির্মিত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। আসাম টাইপের নির্মিত এ ভবনটি সিলেটের শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক প্রতিষ্ঠান। ওইদিন পেট্রোলের আগুনে ৫টি ব্লকের ৪২ কক্ষ পুড়ে ভস্মীভূত করে দেয়া হয়। পুড়ে যায় শতাধিক ছাত্রের বিছানাপত্র ও মূল্যবান সার্টিফিকেট। দেশ জুড়ে আলোচিত এ ঘটনায় সরকারের উপর মহলও স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। সিলেট জুড়ে এ ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এই ছাত্রাবাসের ছাত্র দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও দোষীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানান। ছাত্রাবাসের ছাত্র বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদও ভস্মীভূত ছাত্রাবাসের চিত্র পরিদর্শন করে অঝোর ধারায় কাঁদেন। একই সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিতও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। উভয় মন্ত্রী পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, “অপরাধী যারাই হউক গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হউক।” মন্ত্রীদ্বয়ের নির্দেশনায় ছাত্র-শিক্ষক, সুধী মহল আশান্বিত হয়েছিলেন অপরাধী ধরার বিষয়ে। কিন্তু দীর্ঘ এক বছরের ঘটনা এবং সিআইডির ৮ মাসের তদন্তের পরও দোষীরা সনাক্ত হয়নি বা ধরা পড়েনি। সূত্র জানায়, ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও কলেজ কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। জেলা প্রশাসনের রিপোর্টে বহিরাগতদের দায়ী করা হলেও তাদের চিহ্নিত করা হয়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটি গত বছর ২৯ আগস্ট রিপোর্ট জমা দেয়। ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক, ২৩ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীসহ ৩৯ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়। ২শ পৃষ্ঠার রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কাটিং, ভিডিও ফুটেজ ইত্যাদি সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টে কারো নাম উল্লেখ না করলেও বলা হয়েছে, ছাত্রলীগ-ছাত্র শিবির সংঘর্ষে এক ছাত্রলীগ কর্মী আহত হওয়ার ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগের বহিরাগতরা ছাত্রাবাসে প্রবেশ করে। তখন পুলিশ ফটকে অবস্থান করলেও বহিরাগতদের বাধা দেয়নি। এই বহিরাগতরা ছাত্রাবাসে প্রবেশ করলেই ছাত্রাবাসে অগ্নি জ্বলে ওঠে। তদন্ত রিপোর্টটি কলেজ একাডেমিক কাউন্সিলে জমা দেয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চ মহলে গেলেও দোষীদের সনাক্ত করা যায়নি। উল্লেখ্য, ঘটনার পর ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক ও কলেজের সহযোগী অধ্যাপক বশির আহমদ বাদী হয়ে ১৩ জুলাই শাহপরান থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের কথা উল্লেখ করলে সিলেটের বিভিন্ন মহল তা মেনে নেননি। পরে ঘটনার ৪ মাস পর মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর হয়। ছাত্রলীগ কর্মী উজ্বল আহতের ঘটনাটির তদন্তভারও শাহপরান থানা থেকে সিআইডিতে পাঠানো হয়। এ দুটি মামলা সিআইডির এনামুল তদন্ত করছেন। তিনি জানান, দোষীদের সনাক্ত করতে প্রচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ছাত্রাবাসে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্র আতিকুর রহমান ও জহিরুল ইসলাম আদালতে দুটি মামলা করেছেন। উভয় মামলায় তত্কালীন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি পংকজ পুরকায়স্থ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দেবাংশু মিঠুসহ অর্ধশতাধিক ছাত্রলীগ কর্মীকে আসামি করা হয়।