সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে

পাঁচ সিটিতে হারের দায় দলকেই নিতে হবে

বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভি। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়ার কারণেই সামপ্রতিককালে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হেরেছেন। এর দায়ভার দলকেই নিতে হবে। নারায়ণগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ নেতার নাম উল্লেখ করে দলীয় প্রধানের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে গোটা দেশে আগুন জ্বালাবেন না, এর ফল ভাল হবে না। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘ত্বকী হত্যার বিচারে রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও গণতন্ত্রের সংকট’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। নারায়ণগঞ্জের কিশোর তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যার চার মাসের মাথায় এই আলোচনার আয়োজন করে নারায়ণগঞ্জ ভিত্তিক সংগঠন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। এতে সভাপতিত্ব করেন ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বি। গোলটেবিল আলোচনায় আরও অংশ নেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, অধ্যাপক এম এম আকাশ, ঐক্যবদ্ধ ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য, নারী নেত্রী মালেকা বেগম প্রমুখ। ডা. সেলিনা হায়াত আইভি বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটি পরিবার নিজেদের হীন স্বার্থে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করেছে। যে সন্ত্রাস করছে, চাঁদাবাজি করছে, দল তাকে কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে? এসব সন্ত্রাসীর বোঝা কেন দলের ঘাড়ে নেয়া হচ্ছে? তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৯০ ভাগ মানুষ, প্রতিটি ধূলিকণা জানে যে, ত্বকীর হত্যাকারী কারা? কিন্তু জানে না কেবল সেখানকার প্রশাসন। বর্তমান সরকার এসব খুনী-সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। অবিলম্বে ত্বকীর হত্যাকারী হিসাবে ওই আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে ও ভাতিজাকে গ্রেফতারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, তা না করা হলে নারায়ণগঞ্জের মানুষ চুপ করে বসে থাকবে না। বিগত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসাবে বিজয়ী হওয়া এই মেয়র বলেন, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা আছেন, যারা টাকা খেয়ে ঢাকায় বসে নারায়ণগঞ্জের ওই নেতার পক্ষে কথা বলেন। এসব নেতার জন্যই আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। আজ দলের প্রধানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কাকে সঙ্গে নেবেন। যারা দলকে ভালবাসে, আদর্শের রাজনীতি করে, তাদেরকে? নাকি যারা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও লুটেরাদের তিনি সঙ্গে নেবেন, যারা দলের দুঃসময়ে বিদেশে পালিয়ে যায় এবং দল ক্ষমতায় এলে দেশে ফিরে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও লুটপাট শুরু করে? এদের কারণেই আপনার বদমান হয়। ড.: আইভী বলেন, ত্বকীর হত্যাকারীদের গ্রেফতারে যদি প্রশাসনের ওপর কোনো চাপ থাকে, তাহলে প্রশাসন সেটা প্রকাশ করুক। কোন্ নেতা তাদের ধরতে নিষেধ করছে বলেন। আমরা সেই নেতার কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইব। তিনি বলেন, এটা সবাই জানে যে, স্বনামধন্য এই শহরে নারায়ণগঞ্জ অবক্ষয়ের জন্য দায়ী একটি পরিবার। ড. আনিসুজ্জামান বলেন, দেশে যদি আইনের শাসন না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। ত্বকী হত্যার ব্যাপারে উপযুক্ত তদন্ত করে অবিলম্বে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা দেখছি, রাষ্ট্র সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার পরিবর্তে উল্টো তাদেরকে দিচ্ছে। এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতন্ত্র হয় না। রাষ্ট্রকে মানবিক করতে হলে আমাদের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রাষ্ট্র যখন হত্যাকারীদের পাশে দাঁড়ায় তখন রাষ্ট্রও সন্ত্রাসী হয়ে যায়। সরকারসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান যদি সন্ত্রাসের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে জনগণ কোথায় যাবে? নিরপরাধ কিশোর ত্বকীর হত্যাকারীদের বিচার সরকার যদি না করে, তাহলে পরবর্তী সময়ে এই হত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়ার কারণে অনেককেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত ত্বকী হত্যার বিচার না করলে বর্তমান সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে। ইতোমধ্যে মূল্য পাওয়া শুরু হয়ে গেছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, মানবাধিকারের বিষয়ে আপনি শুধু বক্তব্য দিয়ে যাবেন এটা হতে পারে না। আপনাকে ওই জায়গায় শুধু বক্তব্য দেয়ার জন্য বসানো হয়নি। ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বি বলেন, কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান বাস্তবতা প্রমাণিত হয়ে গেছে। সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় যেসব সন্ত্রাসী-গডফাদার রয়েছে, তাদের গ্রেফতার করতে হবে। নয়তো সিটি করপোরেশনের মতো জাতীয় নির্বাচনেও তাদের একই পরিণতি হবে।