হিসাব এবার জাতীয় নির্বাচনের
শামছুদ্দীন আহমেদ ও মেহেদী হাসান
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৭
পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে হিসাব কষা হচ্ছে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর এই হিসাব-নিকাষ এখন সর্বত্র। অনেকেই বলছেন- স্থানীয় হলেও পাঁচ সিটি করপোরেশনের ভোটের ফল আগামী জাতীয় নির্বাচনের ‘আগাম সংকেত’। রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সকল মহলেই আলোচনায় একটি প্রশ্ন উঠে আসছে- সরকার এখন কি করবে বা কি করতে পারে? নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় যাবে, নাকি নিজ অবস্থানে অনড় থেকে সরকার আরও হার্ডলাইনে যাবে। সরকারের সামনে এটা এখন বড় অগ্নিপরীক্ষা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যেও এখন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সরকার হার্ডলাইনে যাবে না, সেরকম পথে যাওয়ার দরকারও নেই। সংবিধান অনুযায়ীই আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে। সংবিধান যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এ সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মনে করছেন- সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। প্রথমত: পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফলের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা মেনে নেয়া, দ্বিতীয়ত: এ ফলাফলকে গুরুত্ব না দিয়ে আরও হার্ডলাইনে যাওয়া। তিনি ইত্তেফাককে আরো বলেন, হার্ডলাইনে গেলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের মধ্যে আত্মউপলব্ধি আসবে। আমি আশা করি সরকার ভিন্নপথে পা না বাড়িয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার চিন্তা-ভাবনা করবে।
রাজনৈতিক হিসাবে গাজীপুরকে ‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’ হিসেবে মনে করে আওয়ামী লীগ। সরকারের মেয়াদ পূর্তির মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে সেই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর কাছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিরাট ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার ঘটনা সরকারের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গাজীপুর রাজধানীর পাশ্ববর্তী এলাকা হওয়ায় এই ধাক্কাটি আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে সরকারে। চব্বিশ দিন আগে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের কাছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটের পার্থক্যে হারার পর মনোবল ফিরে পেতে অন্তত গাজীপুরে জয় পেতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল আওয়ামী লীগ। ফল উল্টো হওয়ায় স্তম্ভিত দলটির নেতা-কর্মীরা। তারাও এখন হিসাব কষছেন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে। সবদিক পুঙ্খানুপঙ্খ বিশ্লেষণ করে জাতীয় নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য চিত্র পাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, গাজীপুরসহ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমাদের দল সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হয়েছে এটা বাস্তবতা। আমরা কোন কারচুপির চেষ্টা করিনি। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, গাজীপুরের নির্বাচনে অনেক ভোট কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কোন পোলিং এজেন্ট ছিল না। সেখানে তো কারচুপি করার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ কোন অসাংবিধানিক পথে যাবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি আসলে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে আলোচনা চায় না। চাইলে তারা সংসদে তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে আলোচনার জন্য নোটিশ দিয়ে শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতো না। এ নিয়ে তাদের একটি খেলাও থাকতে পারে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত রবিবার বলেছেন ‘গাজীপুরের ফলের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে।’ আওয়ামী লীগ দলীয় একজন সংসদ সদস্য (যিনি একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিরও সভাপতি) ইত্তেফাককে বলেন ‘স্থানীয় আর জাতীয় নির্বাচনের বিভাজনরেখা টেনে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করা অযৌক্তিক। কারণ উভয় নির্বাচনে ভোটার একই। যারা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেন, তারা জাতীয় নির্বাচনেরও ভোটার। কাজেই তাদের রায়কে সংকেত হিসেবে নিতে হবে। এই সংকেত মাথায় রেখেই আগামী নির্বাচন সম্পর্কে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে সারাদেশের চিত্র প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করা সমীচীন নয়। পাঁচ সিটির ভোটের ফল জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন না আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই সদস্য। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারের সামনে কোনো অগ্নিপরীক্ষা নেই। সংবিধানে যেভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, সেভাবেই নির্বাচন হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। এ দল জন্মলগ্ন থেকে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছে। আমরা দেশে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চাই। আর এজন্য আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান অপরিহার্য। বর্তমান সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও কয়েকটি সংসদীয় আসনের উপ-নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকারের অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কা করে বিএনপি সেনা মোতায়নের দাবি জানিয়েছিল। এমনকি নির্বাচনের দিন তারা চার দফা প্রেস ব্রিফিং করে কারচুপির নানা আজগুবি অভিযোগ উত্থাপন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে তাদের প্রার্থীই বিজয়ী হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছি। নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তাদের কাজে সরকারের তরফ থেকে কোন হস্তক্ষেপ করা হয়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ চায় আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হোক। এ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য আমরা বিরোধী দলকে বারবার আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ আলোচনা যে সংসদেই হতে হবে তা নয়। অন্য যে কোন স্থানে তা হতে পারে। গণতন্ত্রের স্বার্থে বিরোধী দলের উচিত আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনায় বসা।
এ সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, পাঁচ সিটির নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনে পড়বে। সরকারের উচিত পাঁচটি সিটি করপোরেশনের ভোটারদের রায়কে সারাদেশের মানুষের রায় হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তত্ত্বাবধায়কের দাবি মেনে নেয়া। জনগণের বার্তাকে অগ্রাহ্য করে কোনো একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা অন্যকিছু করার সাহস সরকার দেখাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তবে তিনি এও বললেন, পাঁচ সিটিতে পরাজয়ের কারণে ভয় পেয়ে সরকার হয়তো ভুল পথে হাটতে পারে, কিন্তু সেটা সরকারের জন্য আরও খারাপ হবে।
আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমদের মতে, সিটি করপোরেশনের নির্বাচন স্থানীয় হলেও সেখানে জাতীয় ইস্যুর প্রভাব ছিল। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে, এটিই বড় কথা। যার কারণে মানুষ বিশ্বাস করে বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনও অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে।
তার বক্তব্যের জবাবে বিএনপির মওদুদ আহমদ বলেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের জন্য আমরা যে আন্দোলন করছি, সিটি করপোরেশনগুলোতে মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের সেই দাবির প্রতিই সমর্থন দিয়েছে, অর্থাত্ মানুষও জানিয়ে দিয়েছে- এ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।