[ গ ণ ত ন্ত্র ]

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ কি আছে?

সাম্প্রতিককালে দেশে অনেকগুলো সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়ে গেল। ক্ষমতার পরিবর্তনও হয়েছে। ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনী বিজয়ের এই ঝোঁক বিএনপি সমর্থিত ১৮ দলীয় জোটের দিকে। ২০০৫-৬-এ এই প্রবণতা ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের। একইভাবে ২০০১-এ বিএনপি ও ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগের দিকে। ১৯৯১ সালের পর থেকে দেশে যত নির্বাচন হয়েছে সব নির্বাচনই আমরা ক্ষমতা পরিবর্তনের আভাস পেয়েছি। কিন্তু যে কারণে সব সময় সরকারে থাকা দল বা জোটের বিরুদ্ধে জনগণের এই অবস্থান সেই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা বা সর্বোপরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়নি। সরকারে থাকা দলগুলো কোনো সময়ই জনগণ তাদেরকে যে কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি। একইভাবে, সরকারে আসতে পারে যারা তারাও সরকারে থাকা দলের প্রতি জনগণের অভিমানের কারণ অনুধাবন করেনি। একটি রাষ্ট্রের জনগণ ক্ষমতার পালাবদলই চায় না। ক্ষমতার বদলের মাধ্যমে তাদের ভোগান্তির অবসান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের নিশ্চয়তা চায়। আর ভোগান্তির অবসান ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চত করার জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর উদ্যোগ। সেই উদ্যোগের প্রতি সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এর ফলে শুধু ক্ষমতার পালাবদলই ঘটবে না। ক্ষমতার পালাবদলের মর্মার্থ উভয়ের নিকট স্পষ্ট হবে। সর্বশেষ গাজীপুর নির্বাচনেও সরকার সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে এবং বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় হয়েছে। এই যে আজমত উল্লার পতন এবং মান্নানের বিজয় তা জনগণের জন্য কি বার্তা নিয়ে এলো? অনেকে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফলকে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন। এ বিষয়ে বিতর্কও আছে। কিন্তু প্রকৃত বিষয় হলো এই পরিবর্তন জনগণের জন্য কি পরিবর্তন নিয়ে আসবে? এ কথা আমরা প্রায় বলে আসছি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত। গত ৪২ বছর আমরা পার করেছি শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লড়াইয়ের নিমিত্তে। কিন্তু এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে শুধু ক্ষমতার পালাবদলই প্রত্যাশিত নয় বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই প্রধান লক্ষ্য সে বিষয়টিতে আমাদের রাজনৈতিক সমাজের মনোযোগ নেই বললেই চলে। সংসদীয় গণতন্ত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রধান দিক হলো কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা। তবে এই ‘কার্যকর’ শব্দের অর্থ ‘হৈ চৈ করা’ সংসদ নয়। কার্যকর সংসদ হলো সংসদে সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ এলাকার জনগণের ভোগান্তির অবসানের কথা বলবেন। কথা বলবেন তাদেরকে যারা ভোট দিয়েছেন তাদের অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য। তবে কার্যকর সংসদ তাদের ভাল ভাল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারকে জনগণের ভোগান্তি নিরসনে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করণে সরকারকে বাধ্য করার মধ্যেই নিহিত অথচ এ ক্ষেত্রে আমরা কোনো ম্যাকানিজমই তৈরি করেনি। ভবিষ্যতে যদি ক্ষমতার পরিবর্তন হয় জনগণের এই প্রত্যাশা নিশ্চিত করা হবে এই নিশ্চয়তা কতটুকু রয়েছে? যারাই ক্ষমতায় আসতে চায় তাদেরকেই এই বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। অন্যথায় ক্ষমতায় পালাবদল হবে কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার হাতছানি থেকেই যাবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন এবং কোনো কোনো অফিসকে কার্যকর করতে উদ্যোগ নেয়াও প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এই কারণে ক্ষমতা বদলের সময় রাজনৈতিক দলগুলো লড়াই করলেও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর সকল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে নয় বরং প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। প্রধানমন্ত্রী অফিস কেন্দ্রিক এই অপরিসীম ক্ষমতার চর্চা জনগণের ভোগান্তি যে বাড়িয়ে তোলে এ বিষয়ে আমাদের কোনো উদ্যোগ নেই। রাষ্ট্রপতির অফিসটি নাম সর্বস্ব হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীকে কোনো কোনো কাজে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর করা প্রয়োজন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যেখানে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি গড়ে উঠেনি সেখানে ব্রিটিশ রাণীর আদলের নাম সর্বস্ব রাষ্ট্রপতির অফিস জনগণের আবেগ অনুভূতির প্রতীক না হয়ে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণের স্বতন্ত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে ফাঁসির আসামিরাও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে যায়। একইভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির মতামত গুরুত্ব পায় না। তাই রাষ্ট্রপতির পদ কার্যকর হলে প্রধান বিচারপতির পদও কার্যকর হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস হলো স্পীকারের অফিস। এই অফিসটি দিন দিন অকার্যকর হচ্ছে। বর্তমানে সংরক্ষিত আসনের সদস্য সংসদের স্পীকার। স্পীকারের অফিসটি এমনভাবে অকার্যকর হতে চলছে যে আগামীতে সংসদ সদস্য নন এমন কোনো ব্যক্তি সংসদের স্পীকার হয়ে বসেন কিনা সে ভয় জাগছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো মানবাধিকার কমিশন। বর্তমান মানবাধিকার কমিশনকে মানুষ ধন্যবাদ দিচ্ছিল কমিশনারের কিছু কিছু বক্তব্যের জন্য। কিন্তু লিমনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ হতাশ। ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করার কোনো উদ্যোগই আমাদের নেই। এই পা হারানো লিমনকে বোঝাপড়ায় আসতে বলা হচ্ছে। ভবিষ্যতের কমিশনার খুনের মামলায় বোঝাপড়ায় আসার পরামর্শ দিবেন কিনা জানি না। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বোপরি, ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় আসে সে দলই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করবে সে প্রশ্ন রয়ে গেল। আবারো কি বিশ্বজিতকে রাজপথে রক্তাক্ত হতে হবে? শেয়ার মার্কেটে দেউলিয়া হবে লাখো মানুষ? তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর নারী শ্রমিকের পোড়াগন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠবে? আবারো কি হরতাল সফল করার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তা জলন্ত বাসে পুড়ে মরবে? রাজনৈতিক দলের অফিসে আক্রমণ, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় বাধা দান, ব্যাপক দুর্নীতি ইত্যাদি চলতেই থাকবে? তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল কোনো কিছুতেই জনতার কিছু আসে যায় না, গণতন্ত্রের অর্থ এই নয়। শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে। এই বিষয়ে ১৪ দলীয় জোট বা ১৮ দলীয় জোটের কতটুকু মনোযোগ রয়েছে? তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজই কতটুকু আগ্রহী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়— এ প্রশ্নগুলো বারবারই ফিরে আসছে। গত ৪২ বছর যাবত্ আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই করেছি। এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকারও চাই। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলগুলোকে এ বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। সুশীল সমাজকেও ক্ষমতায় পালাবদলের ক্রীড়নক না হয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে পথ দেখাতে পারে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনে জনগণের কোনো লাভ নেই। লাভ রাজনৈতিক দলগুলোর। তবে ভুলে গেলে চলবে না সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। তাতে ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা ক্ষমতায় রাজনীতি নয় গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিবেন— এই প্রত্যাশা রইলো। লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়