নীলনদের দেশে নূতন সঙ্কট এবং নূতন আশা

মাত্র দুই বত্সর পূর্বে নীলনদের দেশে আরব বসন্তের পর একসময় গণতন্ত্র আসিয়াছিল। কিন্তু ইহা বড় মনস্তাপের যে, এক বত্সর ফুরাইতে না ফুরাইতে মিসরে গণতন্ত্রিক আকাশের নৈঋত কোণে ঘনকৃষ্ণ মেঘ জমিয়াছে। সেইখানে মাত্রই কয়েকদিন আগে নির্বাচিত সরকারকে অপসারিত করা হইয়াছে। গণতন্ত্র চর্চার অভ্যাস তৈয়ার করিতে যে ‘সময়’ দিতে হয়, তাহা ফুরাইছে অকস্মাত্, বিশেষ কিছু কারণে। কারণ যাহাই হউক, রাজনীতিতে যত ‘তন্ত্র’ রহিয়াছে, তাহাদের ভিতরে গণতন্ত্রই তুলনামূলক সবচেয়ে জনকল্যাণমুখী ব্যবস্থা। যে আরব বিশ্ব গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির অভিযোগে বিদ্ধ ছিল, সেই বিশ্বেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোকবর্তিকাটি জ্বলিয়া উঠিয়াছিল তাহরির স্কোয়ারেই। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি তাহরির স্কোয়ার হইয়া উঠিয়াছিল অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উজ্জ্বলতম প্রতীক। সেই আন্দোলনের অন্য একটি রূপ আজ যদি বিধ্বংসী দাবানলের চেহারা ধারণ করে, তবে তাহা মিসরের জন্য কোনো অর্থেই সুখকর নয়। মোহাম্মদ মুরসির শাসন লইয়া যাহা কিছু অভিযোগ এবং বিক্ষোভ তৈয়ার হইয়াছিল, তাহার সমাধানের পথও গণতান্ত্রিক উপায়েই অসম্ভব ছিল না। যেইভাবে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে হইয়া থাকে, রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনের মাধ্যমে—এইখানেও তাহা হইতে পারিত। হয় নাই, তাহা সর্বার্থেই পরিতাপের। তাই আমরা এক্ষণে দেখিতেছি, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা হইতে অপসারণের পর মিসর ক্রমশ বিস্ফোরণোন্মুখ হইয়া উঠিতেছে। আমরা দেখিয়াছি, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ইতিহাস খুব একটা মধুর নহে। তাহার প্রমাণ রহিয়াছে ১৯৯২ সালে আলজেরিয়া বা ১৯৩৬ সালের স্পেনীয় গৃহযুদ্ধে। গণতন্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সামরিক হস্তক্ষেপের পরেও গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকিবার একমাত্র দৃষ্টান্ত হইয়া রহিয়াছে তুরস্ক, যাহা ঘটিয়াছিল ১৯৯৭ সালে। তবে এইখানেও তুরস্কের সহিত ২০১৩ সালের মিসরের একটি পার্থক্য স্পষ্ট। তুরস্কে সেইসময় প্রধানমন্ত্রী অপসারিত হইলেও সাংবিধানিক কাঠামো এবং নির্বাচিত সংসদ অক্ষুণ্ন ছিল। তাই মিসরে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ ও ঘনায়মান তীব্র গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা লইয়া আমরা উদ্বিগ্ন না হইয়া পারি না। তাহাছাড়া মিসরে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি মারাত্মক হইলে তাহার আন্তর্জাতিক অভিঘাতও সামান্য হইবে না। মিসরের জনসংখ্যা নব্বইয়ের দশকের আলজেরিয়ার প্রায় তিন গুণ এবং গৃহযুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিধ্বস্ত সিরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় চার গুণ। ভৌগোলিকভাবে মিসরকে বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে রাজনৈতিকভাবে অস্থির কিছু ভূখণ্ড। ইহার একদিকে লিবিয়া এবং সুদান, অন্যদিকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন। এই সকল দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত রহিয়াছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিগুলিও। সুতরাং মিসরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সম্ভাবনাকে বিপন্ন করিয়া তুলিতে পারে। যেন বিপুল বারুদ স্তম্ভ জমিয়া উঠিতেছে মিসরের জনমানসে। তাহার বিস্ফোরিত হইবার আলামত আমরা বিগত এক সপ্তাহ ধরিয়া দেখিতেছি নানাভাবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এই সময়ে কমপক্ষে পৌনে এক শত মানুষের মৃত্যু হইয়াছে। এবং যেইভাবে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হইতেছে, তাহাই আমাদের বিবিধ সমীকরণে ভাবাইতেছে। সুতরাং এই বিপন্নতার ভিতরেও আরো কিছু সম্ভাবনার আলোকশিখা আমাদের ভাবনাকে উজ্জীবিত করিতেছে। মিসরের অবস্থা কি এখন ‘সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’? কথাটা এইখানে ‘আশার’। ইহা সেই আশা, যাহা অর্ধশতাব্দী পূর্বে মিসরে তিরোহিত হইয়াছিল গামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যুর পর। পরাশক্তির যেই বিষথাবা দুর্দান্ত প্রতাপ লইয়া এতকাল চাপিয়া বসিয়া রহিয়াছে মিসরের স্কন্ধে, তাহার মুক্তি কি ঘটিতে পারে না এই বিস্ফোরণোন্মুখ জনস্রোতের তোড়ে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, মিসরের জনগণকে এইবার সহজে দাবাইয়া রাখা সম্ভব হইবে না। সুতরাং আলজেরিয়া না হইয়া মিসর এইবার এমন নূতন কোনো দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করিতেই পারে, যাহা আরব বিশ্বে আগে কখনো সার্থকভাবে দেখা দিতে পারে নাই।