সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-সংশয় শুধু দেশবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা চলছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে কী হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। আবার কোনো অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসবে কিনা তা নিয়েও মানুষের মধ্যে ভাবনার কমতি নেই। খোদ সরকারি মহল থেকেই অসাংবিধানিক শক্তির আগমনের আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী ও মহাজোটের নেতাদের এসব বক্তব্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে। সর্বশেষ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘কোনো অসাংবিধানিক সরকার ডেকে আনার চেষ্টা করলে কোনো নির্বাচনই হবে না’ বক্তব্য এই অস্বস্তিকে যেন আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা— ‘তত্ত্বাবধায়ক এলে আপনাকেও জেলে যেতে হবে, আমাকেও জেলে যেতে হবে। তত্ত্ব্াবধায়ক সরকার এলে নির্বাচন হবে না।’ আর তার পরের দিন রংপুরের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে অতীতের মতো কিছু লোক পাওয়া যাবে যারা বলবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রোজ কিয়ামত পর্যন্ত থাকতে পারবে।’ জনগণ প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্যে কেবল অবিশ্বাসের ধূম্রজাল দেখছে। এক ধরনের ভয় ছড়ানোর আবহ পাচ্ছে। এ ধরনের ভয়-আশঙ্কার মাধ্যমে দেশের মানুষ বিব্রত হচ্ছে, হতাশ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের অভিভাবক। তিনি সব প্রতিকূল অবস্থায়ও দেশের মানুষকে অভয় দেবেন, সাহস জোগাবেন, সেটাই তাঁর কাছে প্রত্যাশিত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এসব কী বলছেন! সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের সামপ্রতিক কথাবার্তায় জুজুর ভয় দেখানোটা সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের দাবির সঙ্গে বেমানান। সরকারও স্বীকার করে, দেশ এখন আর সেই ২০০৭ সালের জায়গায় নেই। এখনকার প্রজন্ম শিক্ষিত ও সচেতন নানাভাবে। এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে যেভাবে জুজুর ভয় দেখানো হচ্ছে, তা তাদের দুর্বল আত্মবিশ্বাসকে প্রকট করে তুলছে। একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে আরো আস্থাশীল দেখতে চায় জনগণ। জনগণ এইসব বক্তব্যে হতাশ হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে অসাংবিধানিক শক্তির আসার সুযোগ কোথায়? সরকার দেশ পরিচালনায় ভালো করুক মন্দ করুক, জনগণ এখনো এমন কিছু করেনি যা থেকে অসাংবিধানিক শক্তি জুড়ে বসতে পারে। এমনকি প্রধান বিরোধী দলও নির্বাচন নিয়ে এমন ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টি করেনি যে তৃতীয় কারো হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বরং সরকার আগামী নির্বাচন নিয়ে জনমতের বাইরে কিছু করলেই কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছে মানুষ। সম্প্রতি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন ও সহিংসতা বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ব্যাহত করতে পারে। বিগত মাসগুলোতে রাজপথের সহিংসতা আর বিরোধী দলের বিক্ষোভ-সমাবেশের কথা মনে করে অনেকেই উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে দেশটি বিশৃংখলাপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত হবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় এ আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, দুপক্ষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে কোনো সুরাহা হচ্ছে না। বলা চলে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত সরকারকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে জনগণের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। অভিজ্ঞতা বলে, জনমতকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা কখনও ভালো হয় না। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হবে না। আর তা না হলে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। ওই ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং যে কোনো বিচারে সরকার পক্ষকে নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারই কেবল পারে অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ করতে। বাংলাদেশের নব্বই পরবর্তী সব কটি রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতির জন্য তত্কালীন সরকারগুলোর একগুঁয়েমিই দায়ী ছিল, জনগণ নয়। আশা করি, অবিশ্বাস ও ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রধানমন্ত্রী দ্রুতই আগামী নির্বাচনী সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। সরকার পক্ষ আন্তরিকভাবে বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করলে বিরোধী দল তাতে ইতিবাচক সাড়াই দেবে। বর্তমান সংকট বস্তুত পারস্পরিক অনাস্থা থেকে উদ্ভূত। এ অনাস্থা দূর করতে হলে উভয়পক্ষকে একগুঁয়েমি পরিহার করতে হবে। ভাঙতে হবে অযৌক্তিক অনমনীয়তা। দুই পক্ষের অনমনীয়তার কারণে যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে দেশের, প্রাণহানিও ঘটেছে অনেক। এই পরিস্থিতি থেকে জাতি পরিত্রাণ চায়। ঢাকা