ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ
দেশে দুর্নীতি বেড়েছে
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৩, ২২:৩৭
ধারণাগতভাবে বাংলাদেশে দুর্নীতি আরও বেড়েছে। তবে সেবাখাতে ঘুষ লেনদেন আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে এবার চিহ্নিত হয়েছে যৌথভাবে রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। দ্বিতীয় শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবা কার্যক্রম। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক ‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনটি।
বাংলাদেশে প্রতিবেদনটি প্রকাশের জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গতকাল সকালে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র পরিচালক রফিকুল হাসান ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক শাহনূর রহমান। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বার্লিন ভিত্তিক টিআই এ বছর ১০৭টি দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ২৭০ জনের ধারণা ও অভিজ্ঞতার ওপর জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে জরিপ চালানো হয় এক হাজার ৮২২টি খানার বাছাইকৃত তথ্যদাতাদের কাছ থেকে। জরিপটি পরিচালিত হয়েছে এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। তারা জানান, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা অনুযায়ী ২০১১-১২ সালে বাংলাদেশে সামগ্রিক দুর্নীতি বেড়েছে। মোট উত্তরদাতার ৯৩ শতাংশ মনে করেন বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠান হলো রাজনৈতিক দল। টিআইয়ের জরিপে এবারই প্রথম রাজনৈতিক দল দুর্নীতির সর্বোচ্চ ধাপে উঠে এসেছে। এছাড়া ৮৯ শতাংশ তথ্যদাতা মনে করেন রাজনৈতিক দলের পরেই সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো বিচার বিভাগ। একই জরিপে তথ্যদাতাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১-১২ সালে সরকারি ৮টি সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের হার কিছুটা কমেছে। এই খাতগুলো হলো পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, ভূমি-সেবা, রেজিস্ট্রেশন ও পারমিট সেবা, স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা, শিক্ষা, পরিষেবা ও কর।
রাজনৈতিক দল কিভাবে সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে চিহ্নিত হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু সরকারি খাতসহ রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মাধ্যমেই অধিকাংশ দুর্নীতি সংঘটনের চেষ্টা করা হয়, সে কারণেই তথ্যদাতারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। তবে বাংলাদেশের জন্য আশার বিষয় হচ্ছে, জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে আগ্রহী। কিন্তু তারা এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে সক্রিয় সাড়া বা সহযোগিতা পাচ্ছে না। আমরা মনেকরি জনগণ, সরকার এবং রাজনীতিবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বাংলাদেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুষ প্রদানের কারণ হিসেবে ৫৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র পথ। উত্তরদাতাদের ৭৬ শতাংশ বাংলাদেশে সরকারি খাতের দুর্নীতিকে খুবই গুরুতর সমস্যা বলে মনে করেন। বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন সরকারি সেবাখাতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি বিশেষ মহল, বিশেষত রাজনৈতিক দল বা কর্মী এবং বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী দ্বারা বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। দুর্নীতির ঘটনা জানানোর ক্ষেত্রে উত্তরদাতাদের ৩১.৪ শতাংশ জনপ্রতিনিধির ওপর আস্থাবান। ১৮.৮ শতাংশের জনের আস্থা নিয়ে ২য় অবস্থানে রয়েছে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এছাড়া দুদকের কাছে জানাতে চান ১১.৪ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের তথ্যদাতাদের ৩২ শতাংশের অভিমত হলো দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ অকার্যকর। এর আগে ২০১০ সালের জরিপে ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করতেন দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। ২০১২ সালের জরিপে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদক্ষেপের ওপর আস্থা রেখেছেন মাত্র ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি টিআইবি’র পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক, নীতি-নির্ধারণী পর্যায় এবং সচেতনতা, প্রচারণা ও অ্যাডভোকেসি বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশমালা তুলে ধরে মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস উদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।