বই আলোচনা

নতুন মলাটে পুরাতন সত্যজিত্

কম লেখাপত্তর হয়নি সত্যজিত্ রায়কে নিয়ে। তারপরও তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের নেশা থেমে নেই। থমকে যায়নি তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ। সত্যজিতের সৃষ্টি আর স্রষ্টা হিসাবে সত্যজিতের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই আগ্রহী করে তুলেছে চলচ্চিত্রপ্রেমী ও গবেষকদের। তাই আজ অবধি নতুন বইপত্র যেমন বেরোচ্ছে, তেমনি পুরনো লেখা নিয়ে বেরোচ্ছে নতুন সংগ্রহ। এমন এক পুস্তকের নাম ‘সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি’, রচনা সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন সাজেদুল আউয়াল। বইখানা সাজানো হয়েছে চার ভাগে। প্রথমভাগের শিরোনাম—সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির নানাদিক। এই ভাগ শুরু হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক বাতিঘর ঋত্বিক ঘটকের লেখা দিয়ে—‘একমাত্র সত্যজিত্ রায়’। এই লেখায় ‘পথের পাঁচালী’কে বিবেচনায় নিয়ে সত্যজিতের ভেতর ‘জাতশিল্পী’র ছায়া আবিষ্কার করেন ঋত্বিক। সত্যজিতের বিশ্ববীক্ষায় বাস্তববাদকে আবিষ্কার করেন পার্থপ্রতীম বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ‘সত্যজিত্ রায়ের বিশ্ববীক্ষা’ রচনায়। দ্রোহের আকাঙ্ক্ষা নয়, সত্যজিতের কাজে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত দেখেছেন রাজনীতির চড়া সুর—যেখানে ধরা পড়েছে সমাজের নানা অসঙ্গতি ও সমস্যা। সত্যজিতের সমাজচেতনার বহিঃপ্রকাশ সূক্ষ্ম কারুকাজে—এমনটাই মনে করেন আরেক স্রষ্টা বুদ্ধদেব। এই একই বিভাগে এরপর একে একে স্থান পেয়েছে ধ্রুব গুপ্ত, অমর্ত্য সেন, উত্পল দত্ত, গৌতম ভদ্র, প্রলয় শূর, রবিন ঘোষ, শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায়, ধীমান দাশগুপ্ত, তারেক মাসুদ, পল্লব সেনগুপ্ত ও অমিতাভ চট্টপাধ্যায়ের লেখা। এঁদের অন্যান্য রচনা থেকে সংগ্রাহক ও সম্পাদক, স্রষ্টা হিসাবে সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি ধরা পড়েছে, তেমন লেখাগুলো নিয়েই প্রথম অধ্যায় সাজিয়েছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম ‘সত্যজিত্-সৃষ্ট চলচ্চিত্রবীক্ষণ’। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে সত্যজিতের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা ঠাঁই পেয়েছে এই ভাগে। দ্বিতীয়ভাগের প্রথমে স্থান পেয়েছে চিদানন্দ দাশগুপ্তের ‘অপু-ত্রয়ী’। অপু ট্রিলজি নিয়ে রয়েছে আরো একটি লেখা— তানভীর মোকাম্মেলের ‘সত্যজিত্ :নিওরিয়ালিজম ও জীবনের বীক্ষা’। এর পাশাপাশি রয়েছে সোমেশ্বর ভৌমিকের ‘পথের পাঁচালীর প্রাসঙ্গিকতা’। দুই মলাটের ভেতর স্থান পেয়েছে অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, পার্থপ্রতীম চৌধুরী ও সত্যপ্রকাশের প্রবন্ধ—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য থেকে নেয়া সত্যজিত্ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোই তাঁদের আলোচনার ভরকেন্দ্র। সত্যজিতের অন্যান্য সাহিত্যনির্ভর, মৌলিক ও ছোট ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে নাজিমুদ্দীন শ্যামল, সোমেন ঘোষ, নিত্যপ্রিয় ঘোষ, দীপক সেনগুপ্ত, দেবাশীষ রায়, ইরাবান বসুরায় ও নবীনানন্দ সেনের রচনায়। তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘সত্যজিত্-সৃষ্ট চলচ্চিত্রের উপকরণসমূহের মূল্যায়ন’— অর্থাত্ সত্যজিতের চিত্রনাট্য, অভিনয় বিষয়ক শিক্ষাদান, ক্যামেরা, সংগীত, আবহসংগীত ইত্যাদি সম্পর্কিত লেখার সমাবেশ ঘটেছে এই অধ্যায়ে। অনিল চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবিউল হুসাইন, আনোয়ার হোসেন, গৌতম ঘোষ, হীরেন্দ্র চক্রবর্তী, পুলক গুপ্ত ও অতনু চক্রবর্তীর প্রবন্ধ সংগৃহীত হয়েছে এইভাগে। ‘স্ব-স্রষ্টাবৃত্তি প্রসঙ্গে সত্যজিত্’ শিরোনাম নিয়ে চতুর্থ ও শেষভাগে রয়েছে একমাত্র শুভেন্দু দাশগুপ্তের ‘সত্যজিত্ রায় : নিজের কথায়’ শীর্ষক লেখাটি। সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস এমন নানা বিষয়ে সত্যজিতের কথাগুলোই উদ্ধার ও সংকলিত করেছেন শুভেন্দু। পুরো বইতে সত্যজিত্ সম্পর্কে নতুন কিছু বলা হয়েছে বা গোটা বইটাই নতুন একটা প্রয়াস সেটা বলা যাবে না, তবে অনেকগুলো বিলুপ্তপ্রায় ও সত্যজিত্ রায়কে বোঝার ক্ষেত্রে দরকারি অনেকগুলো লেখা এক মলাটে পাওয়া যাচ্ছে—এই সুবিধার কথা অস্বীকারের উপায় নাই। সে জন্য ধন্যবাদ দিয়ে অনেকেই সংগ্রাহক ও সম্পাদক সাজেদুল আউয়ালকে আরো বড় করতে পারেন। তিনি ঋত্বিক ঘটককে নিয়েও একইরকম একটি কাজ (ঋত্বিকমঙ্গল) করেছিলেন কয়েক বছর আগে। চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক, গবেষক ও শিক্ষক সাজেদুল আউয়ালের চলচ্চিত্র নিয়ে সর্বশেষ এই গ্রন্থটি— ‘সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি’— চলচ্চিত্রপ্রেমী ও গবেষকদের প্রয়োজন মেটাবে বলেই আশা করছি। চোখের তৃষ্ণা মেটাতে বইয়ের শেষ অংশে রয়েছে সত্যজিত্ রায়, তাঁর আঁকা স্কেচ ও শুটিঙের কিছু স্থিরচিত্র। সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি সংগ্রহ ও সম্পাদনা : সাজেদুল আউয়াল প্রকাশনা সংস্থা : নান্দনিক প্রকাশকাল :একুশে বইমেলা ২০১৩ পৃষ্ঠা : ৫১৮ মূল্য :৮০০ টাকা