রমজানুল মুবারকে সিয়াম সাধনার গুরুত্ব ও তাত্পর্য
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৪
ইসলামের পাঁচ প্রধান পালনীয় বিধানের মধ্যে মাহে রমজানে রোজা পালন অন্যতম। কেননা মাহে রমজানেই ’হুদাল্লিন্নাছি’(মানুষের জন্য হেদায়েত) ’বায়্যিনাতিম-মিনাল হুদা’ (সত্পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ) এবং’ ফুরক্কান” (ন্যায়- অন্যায়ের পার্থক্য নির্দেশকারী) হিসেবে আল কুরআন অবতীর্ণ হয়। আল কুরআনে মানবের সার্বিক কল্যাণের যাবতীয় পন্থা ও পথনির্দেশ রয়েছে। মাহে রমজানে রোজা পালন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তরফ হতে এক বিশেষ নির্দেশ হিসেবে বলা হয়েছে, “হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করে দেয়া হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল, তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেন তোমরা এর মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করতে পার।” (২ সংখ্যক সুরা বাকারা আাায়াত ১৮৩) । আলকোরআনেই মাহে রমজানের মাহাত্মও বর্ণনা করা হয়েছে । বলা হয়েছে ’ রমজান মাস এমন একটি মাস, এই মাসেই কুরআন মজীদ নাজিল করা হয়েছে।’ (সূরা বাকারা আয়াত ১৮৫)। এই আয়াতের পরবর্তী বাক্যে উল্লেখ করা হয়েছে ’ কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে যেন অবশ্যই এ মাসের রোজা পালন করে।’ তবে মাহে রমজানে রোজা পালনের আবশ্যিক এ বিধান এ মাসে ’অসুস্থ’ আর ’মুসাফির’ দের জন্য শিথিল করে দিয়ে বলা হয়েছে ’অন্য সময়ে সে রোজা পুরণ করে নিতে হবে । আর এটিও যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হবে ,তারা এর পরিবর্তে একজন মিস্কীনকে খাদ্যদান করবে।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়াম সাধনার এ সুযোগকে তার প্রিয় বান্দাদের জন্য ’সহজ করতে চান’, তিনি ‘কোন জটিলতা কামনা করেন না।’ আর এ মহাসুযোগ এনায়েত করার জন্য কুরআনই শিখিয়ে দিয়েছে ’তোমাদের হেদায়েত দান করার জন্য আল্লাহ তায়ালার মহত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ সুতরাং দেখা যাচ্ছে সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব আল-কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার গৌরবে দীপ্ত ও তাত্পর্যমন্ডিত মাহে রমজান। কেননা, এ রোজা পালনের মধ্যে রয়েছে ‘অধিকতর কল্যাণ’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৪)। বস্তুত সিয়াম সাধনা কৃচ্ছ্রতা সাধনের এমন এক পর্যায় যা আত্মশুদ্ধির সুযোগকে করে অবারিত এবং আর আনে সৃষ্টিকর্তার অসীম রহমতের প্রাপ্তিতে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগলাভে অনাবিল আনন্দ।আত্মিক,শারিরীক, মানসিক ও সর্বোপরী সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিতকারী এমন কল্যাণপ্রদ পরিপালণীয় বিষয় আর নেই। শুধুমাত্র আল-কুরআন নয়, মাহে রমজানে অন্যান্য আসমানী কিতাবসমুহও অবতীর্ণ হয়েছিল। হজরত ওয়াসেলাহ ইবনে আসকা (রা.) বর্নিত হাদিসে উল্লেখিত আছে,রসূলে করিম (স.) বলেছেন, ’হজরত ইবরাহীম (আ.) এর সহীফাসমূহ রমজান মাসের প্রথম রাত্রিতে নাজিল হয়েছে। তাওরাত হজরত মুসা (আ.) এর প্রতি রমজান মাসের ছয় তারিখে দিবাগত রাতে, হজরত ঈসা (আ.) এর প্রতি ইনজিল কিতাব এই মাসের ১৩ তারিখে এবং মহানবী (স.) এর প্রতি কুরআন শরীফ রমজান মাসের ক্বদর রাতে নাজিল করা হয়েছে (মসনদ আহমদ) । হজরত জাবের (রা.) বর্নিত অপর এক হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে, ‘জবর’ রমজান মাসের ১২ তারিখে নাজিল হয়েছে। আসমানী কিতাব আল কুরআন ’ মানবজাতির জন্য সুসপষ্ট দলিল’ (সূরা জাসিয়া, আয়াত ২০) , জগতসসূহের প্রতিপালকের নিকট হতে প্রেরিত (সূরাশুয়ারা, ১৯২) এবং হযরত মুহামমদ (স.) এর প্রতি (সূরা মুহামমদ,আয়াত ২ ) এক মহিমান্বিত রজনীতে (৯৭ঃ১) সমমানিত বার্তাবাহকের (জিবরাইল আ.) (৮১ঃ১৯) মাধ্যমে অবতীর্ণ শুরু হয়।এ কিতাব ’ সঠিক বিধান ’ (৯৮ঃ২), ’মীমাংসাকারী বাণী’ (৮৬ঃ১৩), উপদেশ (৭৬ঃ২৯) এবং নিশ্চিত সত্য (৬৯ঃ৫১) । এ কিতাব কোন কবির রচনা নয় (৬৯ঃ৪১) এবং কোন গণকের কথাও নয় ( ৬৯ঃ৪২)। এ কিতাব বিশ্বাসীদের পথ নির্দেশ (৪৫ঃ২০)। মাহে রমজানের অশেষ কল্যাণ ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনে নিশ্চিত করতে আল-কুরআনের মহান শিক্ষা ও নির্দেশনা এক বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। আল কুরআন এবং মাহে রমজান পারসিরক সুত্রে গাঁথা এবং মানবতার সার্বিক কল্যাণে এক অবিনশ্বর অবলম্বন। আধুনিক বিশ্বে মানবতার আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রেক্ষিত পর্যালোচনা করলে এটা সপষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, নৈতিকতা ও আদর্শিক মুল্যবোধের বিকাশ অতীব প্রয়োজন। মাহে রমজানে রোজা পালনের অতীব তাত্পর্য নির্দেশিত হয়েছে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বোখারী (রহ.) সংকলিত এবং হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদীসে- নবী করিম(স.) বলেছেন ’ রোজা (যাবতীয় অপকর্ম আর পাপাচার থেকে শরীর ও মনের) জুন্নাহ্ বা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং রোজাদার ব্যক্তি অশ্লীল কথা বলবে না বা জাহেলী আচরণ করবেনা। কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে উদ্যত হলে বা গাল মন্দ করলে সে বলবে , আমি রোজা রেখেছি। কথাটি দু’বার বলবে। যার মুষ্টিতে আমার প্রাণ সে আল্লার শপথ, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লার কাছে মেশকের সুগন্ধ অপেক্ষাও উত্কৃষ্ট।
লেখক :সাবেক সচিব এবং এন বি আর এর চেয়ারম্যান