রোজা ও আধুনিক বিজ্ঞান
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪৫
শারীরিক ইবাদত সমূহের মধ্যে রমজান মাসের রোজা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ইবাদত। হিজরী দ্বিতীয় সনে রমজান মাসের রোজা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ করা হয়েছে। নামাজ এবং যাকাতের ন্যায় রোজাও স্মরণাতীত কাল হতে পূর্ববর্তী পয়গম্বর এবং তাদের উম্মতের ওপর কোন না কোন রূপে ফরয ছিল। রোজার আদেশ দান প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কালামে বলেন: ‘‘ হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। আশা করা যায় তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারবে।” (বাকারা: ১৮৩)। ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। ইসলাম যেখানে স্বীয় অনুসারীদের কিছু বিধি-নিষেধ দিয়ে থাকে সেখানে হেফাজাতের বিষয়ও সরবরাহ করে থাকে। ইসলাম যেমনিভাবে আমাদের নামাজের নির্দেশ দিয়েছে তেমনি সাথে সাথে তাতে রেখে দিয়েছে এক সুন্দর জিন্দেগী যেখানে রয়েছে জীবনের এক নতুনত্ব। অনুরূপভাবে রোজার মধ্যে যেভাবে রয়েছে আল্লাহর নির্দেশ তেমনি তাঁর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য অগনিত পার্থিব কল্যাণ। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “তোমরা রোজা রাখ তাহলে সুস্থ্য থাকতে পারবে”। হাদীসের বহু কিতাবে এর অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে যে রোজার মধ্যে রয়েছে মানব জাতির রোগ মুক্তি। রোজার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শৃংখলা, সংযম ও ধৈর্য্য শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তা কুপ্রবৃত্তি দমনে সহায়ক হয়। মানুষের মধ্যে থেকে খারাপ দিকগুলো আস্তে আস্তে দূর হয়ে যায়। “হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (স.) বলেছেন, রোজা হল ঢাল (শয়তানের হামলা হতে বাঁচার জন্য) স্বরূপ। সুতরাং তোমরা যখন রোজা রাখবে, তখন অশ্লীল কথা বলবে না এবং ঝগড়া ফাসাদও করবে না। হাঁ কেউ যদি রোজাদারকে গালি দেয়, কিংবা তার সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ করে তাহলে তার এ বলে জবাব দেওয়া উচিত যে, আমি রোজাদার। সমাজের মানুষগুলোর নৈতিক উন্নতির সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়। এ কারণেই রমজানে রোজা রাখার পরও তারাবীর নামাজ পড়তে হয়। যাতে মানুষের মধ্যে পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে উঠে। এবং সেই সাথে খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছাও নিয়ন্ত্রিত হয়। গান্ধিজীও রোজা রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বলতেন “মানুষ খেয়ে খেয়ে স্বীয় শারীরকে অলস বানিয়ে ফেলে। আর অলস শরীর না জগত্বাসীর আর না মহারাজের। যদি তোমরা শরীরকে সতেজ ও সচল রাখতে চাও তাহলে শরীরকে দাও তার নূন্যতম আহার, আর পূর্ণ দিবস রোজা রাখ। আর সন্ধ্যাবেলা বকরীদুগ্ধ দ্বারা রোজা খোল। বাদশা সেকান্দর আযম বলেন, আমি হিন্দুস্থানে কোন কোন এলাকাতে এমন তীব্র গরম প্রত্যক্ষ করেছি যেখানে সবুজ তরুলতা পর্যন্ত জ্বলে গিয়েছে। অথচ আমি সেই উষ্ণ এলাকাতেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার না করেই কাটিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তখনও আমি অনুভব করেছি নিজের মধ্যে এক প্রকার সজীবতা ও শক্তি সামর্থ। ইসলাম আমাদের দুঃখীজনের লালন পালনের পদ্ধতি শিক্ষা প্রদান করে। উদরপূর্তি থাকলে অন্যের ক্ষুধা সম্পর্কে অনুভব করা যায় না। আর পানি দ্বারা জিহবা তরতাজা থাকলে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির পিপাসার জ্বালা অনুভব করা যায় না। রোজা মুসলমানদের দয়া, করুণা ও গরিব দু:খীর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ও শিক্ষা দেয়। রোজা হল এক উত্তম বস্তু, যার দ্বারা অনেক কল্যাণ অর্জিত হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: “ যে ব্যক্তি খুশির সাথে সত্কর্ম করে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ তবে তা তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণময়, যদি তোমরা বুঝতে পার” (সূরা বাকারা: ১৮৪)। কিছুদিন পূর্বেও মনে করা হত, রোজা দ্বারা শুধুমাত্র হজম প্রক্রিয়াতে প্রশান্তি মেলে। কিন্তু দিন বদলে চিকিত্সা বিজ্ঞানও দ্রুত উন্নত হচ্ছে। তাই এখন স্বীকার করা হয় যে, রোজা হল এক স্বভাবগত মোজেযা। আমেরিকানরা মনে করেন, বছরের কিছু সময় মানুষের জন্য এমনভাবে অতিবাহিত করা উচিত যেন সে ডায়টিং করে স্বীয় হজম পদ্ধতিতে (Digestive system) কিছু সময়ের জন্য অবসর রাখবে। এভাবে তার মধ্যে বিদ্যমান আর্দ্রতা যা সময় সাপেক্ষে বিষে পরিণত হয়ে যায় তা রোজা দ্বারা নি:শেষ হয়ে যায়। আর এই মারাত্মক আদ্রতা নি:শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক জটিল রোগ নি:শেষ হয়ে যায়। এই রোজার মাধ্যমে যকৃত চার থেকে ছয় ঘন্টা পর্যন্ত বিশ্রাম পায়। আর এই যকৃতের কঠিনতম কাজের মধ্যে একটি হল হযম না হওয়া খাদ্যদ্রব্য ও হযম হওয়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। রোজার কারনে সেই যকৃত বলবর্ধক খাবারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ থেকে মুক্ত থাকতে পারে।