রমজানে যাকাত আদায় অধিক পুণ্যের কাজ

মহান আল্লাহ্র সমীপে মানুষের সব সামর্থ্য সবিনয়ে সমর্পন হলো ‘ইবাদত’। আবার পবিত্র রমজানের অনুসঙ্গ ‘যাকাত-ফিতরা’। যার একটি ফরজ অন্যটি ওয়াজিব। অজ্ঞতা ও অস্পষ্টতার জন্য ফরজ হওয়া সত্ত্বেও অনেকে যাকাত আদায়ে আন্তরিক নয় অথচ মানুষ কুরবাণীর জন্য মহা তত্পর কিন্তু কুরবাণী ওয়াজিব আর যাকাত ফরজ। শরী’আ মতে কারো যাকাত ফরজ হওয়ার মত অর্থ-সম্পদ ফিতরা আদায়ের সময় থাকলে তার জন্য ‘সাদ্কাতুল ফিতর’ , কুরবাণীর সময় থাকলে কুরবাণী ওয়াজিব, আর ঐ অর্থ-সম্পদ সারা বছর একজনের কাছে সঞ্চিত থাকলে তার জন্য যাকাত আদায় করা ফরজ হয়ে যায়। যাকাতের অন্যতম শর্ত হলো— সম্পদ নিত্য ব্যবহার্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া। এ বিবেচনায় সাড়ে সাত তোলা বা ভরি (৮৭.৪৫ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ভরি (৬১২.৫৩ গ্রাম), রৌপ্য, ব্যবসার পণ্য অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ যা সাংবাত্সরিক দৈনন্দিন আহার বিহার ঘর গৃহস্থলি প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং তা কোন মুসলমানের মালিকানায় একবছর অতিবাহিত হয় তবে তা থেকে ০২.৫% মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য সূরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে বর্ণিত আটটি খাতে (ফকির, মিসকিন, নও মুসলিম, মুসাফির, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ঋণগ্রস্থ, কৃতদাস, মুজাহিদ) ব্যয় করাকে যাকাত বলে। আবার একজন মুসলমানের সব ‘বৈধ ও পবিত্র’ সম্পদের প্রকৃতি অনুযায়ী যাকাতের বিধান ও পরিমাণ রয়েছে। যেমন উত্পাদিত ফসল, ব্যবসার মাল, গৃহপালিত পশু, খনিজ সম্পদ, অলঙ্কারাদি, গুপ্তধন ইত্যাদি। স্বর্ণ , রৌপ্য ও নগদ অর্থকে একক নির্ধারণ করে যাকাত ধার্য হয়। যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ভরি রৌপ্যের বাজার মূল্য (১২০০৫২.৫) তেষট্টি হাজার টাকা হয় তবে এমন নগদ অর্থ সম্পদের অধিকারীর জন্য একহাজার পাঁচশ পচাত্তর টাকা যাকাত আদায় করা ফরজ। অনুরূপ উচ্চতম একক হিসেবে সাড়ে সাত তোলা বা ভরি স্বর্ণের বাজার মূল্য (৪৩,২০০৭.৫) তিন লক্ষ চব্বিশ হাজার টাকা হলে অথবা আরো বেশি অর্থ সম্পদের অধিকারী হলে তারও ০২.৫% যাকাত আদায় করা ফরজ। (প্রতি এক লক্ষ টাকায় দু’হাজার পাঁচশ টাকা) তবে শুধু পরিমাণ নয় নতুন পুরান স্বর্ণের বাজার মূল্যের পার্থক্য, খাদ ও তৈরীর মজুরি ব্যতীত নিরেট নগদ বিক্রয় মূল্য (যা এখন পাওয়া যাবে) হিসেব করে যাকাত আদায় করতে হয়। স্বর্ণের পরিমান সাড়ে সাত তোলা বা ভরির চেয়ে কম হলেও এবং তার সঙ্গে নগদ অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদকে হিসেবে এনে ঐ সম্পদের আথির্ক মূল্যমান রৌপ্যের বাজার মূল্যের পরিমিত এককে হিসেব করে যাকাত আদায় করতে হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ ও ব্যাপক পড়াশোনা করা ঈমানি কর্তব্য বা ‘জরুরিয়্যাত্-ই-দ্বীন’। কেননা, যাকাত অস্বীকার করা কুফরি , আদায় না করা কবিরাহ্ গুনাহ্। ‘সাদকাতুল ফিত্রার তাত্পর্য প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন “রসূল (স.) ফিতরা অবশ্যই আদায় যোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন । রোজাদারকে অযথা অবাঞ্জনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কাজকর্মের মলিনতা থেকে পবিত্র করবার জন্য এবং গরিব মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য তিনি (স.) ফিতরার প্রবর্তন করেছেন ” (তিরমিযি)। প্রিয়নবী (স.) ফিতরা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে গম, খেজুর-খোরমা, কিশমিশ ,পনির ইত্যাদিকে নির্ধারণ করেছেন। ইমাম আবুহানিফা (রহ.) এর মতে এসব দ্রব্যের মধ্যে যেটির বাজার মূল্য সর্বাধিক তা দিয়েই ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। অন্যদিকে ফিতরার সঙ্গে ব্যক্তির সামর্থ্য ও গরিবের স্বার্থ জড়িত। তাই ফিতরার নূনতম ও উচ্চতম পরিমান নির্ধারিত থাকা একান্ত জরুরি। আমাদের দেশে এক সের সাড়ে বার ছটাক গম বা আটার বাজার মূল্যে ফিতরা ধার্য করা হয়। যা ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমান এবং এতে সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষ দানে উত্সাহিত হয়। আবার ফিতরা নির্ধারণে ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, রুচি, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় আনা উচিত। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। তাই চালের মূল্যমানেও ফিতরা ধার্য হতে পারে। জুতা কিনলে অথবা মোবাইলে কথার জন্যও ১৫% ভ্যাট দিতে হয়, আর লক্ষ টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স এবং প্রায় ‘অলস অর্থ ’ হিসেবে সঞ্চিত স্বার্ণালঙ্কারে ০২.৫% যাকাত দেওয়া যাবে না? অন্যদিকে পদস্থজনের ফিতরা ৪০ / ৪২ টাকা হতে পারে ? বস্তুত যাকাত ফিতরা অর্থনৈতিক ইবাদত — যার সঙ্গে সম্পদের গতিশীলতা, পবিত্রতা এবং দারিদ্রমুক্ত সমাজ বিনির্মানের সচল সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয়ভাবে পর্যালোচনা, প্রচারণা বিশেষভাবেই প্রয়োজনীয়। কেননা, ইবাদতের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও অপূর্ণতা কাম্য নয়। লেখক :কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অধ্যাপনারত