ইফতার রাজনীতি :শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় দুই দল

বর্তমান মহাজোট সরকারের শাসনামলে এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এটাই শেষ রজমানের মাস। এজন্য এবারের রোজার মাসকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। ভোটের আগে রাজনৈতিক মিত্র বৃদ্ধির এবং পুরনো সম্পর্ক নবায়নে ইফতার পার্টি আয়োজনকে অন্যতম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চায় তারা। সেই লক্ষ্যে এবারের রোজার মাসজুড়ে ধারাবাহিক ইফতার পার্টি আয়োজনের মাধ্যমে কার্যত: রাজনৈতিক বন্ধু বলয় বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। প্রধান দুটি দল ছাড়াও উল্লেখযোগ্য অন্য দলগুলোও আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখে নিজেদের গুরুত্ব বৃদ্ধি ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ইফতার মাহফিল আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছে। সবারই লক্ষ্য-এবার ইফতার পার্টির মাধ্যমে বন্ধুশক্তি প্রদর্শন। রাজনৈতিক মিত্র বৃদ্ধি ও বন্ধু বহরের মহড়া প্রদর্শনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনীতিবিদদের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনীতিকদের সম্মানে পৃথক ইফতারের আয়োজন করবে দুটি দল। একইসঙ্গে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সম্মানেও ইফতার পার্টি দেবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল। এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) ও জামায়াতে ইসলামীও এই প্রতিযোগিতায় মাঠে নেমেছে। এছাড়া জাতীয় পার্টি-জেপি, বিকল্পধারা, এলডিপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)সহ আরও কয়েকটি দলও এবার ইফতার মাহফিল করছে। এসব ইফতার পার্টিতে সবাই সমমনা ছাড়াও অন্য দলগুলোকেও দাওয়াত করছেন। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ এবার দলীয়ভাবে সীমিত আকারে দু’একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করতে পারে। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গণভবনে ধারাবাহিক ইফতার মাহফিলের কর্মসূচি রাখছেন। তিনি এবারও রাজনীতিক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন বলে জানা গেছে। রাজনীতিকদের সম্মানে দেয়া ইফতার পার্টিতে মহাজোট শরিক ছাড়াও বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দলকেও আমন্ত্রণ জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনীতিকদের সম্মানে আগামী ১৩ জুলাই ইফতার পার্টির আয়োজন করছেন। জাতীয় সংসদ সংসদের ‘পার্লামেন্ট মেম্বারস ক্লাবের’ এলডি-২ হলে অনুষ্ঠেয় এই ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সকল সদস্য ও সাধারণ সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। মহাজোট শরিক জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি কাদের সিদ্দিকী ও জেএসডি সভাপতি আ.স.ম রবকেও এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া ১৮ দলীয় জোটের সকল শরিক ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদের এবং দুটি জোটের বাইরে থাকা অন্যান্য দলের প্রধানদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা। এদিকে, আজ শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মহাজোট ও ১৪ দল শরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। খালেদা জিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এরশাদ। তার পক্ষে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গুলশান কার্যালয়ে দেখা করে ইফতারের দাওয়াতপত্র তুলে দেন। ইফতারের দাওয়াত দেয়ার সুযোগে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন ও জোট-মহাজোটের রাজনীতি নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠকও করে ফেলেন কাজী জাফর আহমেদ, তার সঙ্গে ছিলেন জাপার আরেক নেতা তাজুল ইসলাম চৌধুরী। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ইফতার পার্টিতে দু’দলই চাইছে নিজেদের জোটের বাইরেও প্রত্যাশিত সকল দলের সমাবেশ ঘটাতে। উল্লেখযোগ্য ছোট-মাঝারি দলগুলোর মধ্যে কে কত বেশি সংখ্যক দলকে নিজের ইফতার পার্টিতে উপস্থিত করতে পারে, অপ্রকাশ্যে এখন সেই প্রতিযোগিতাই চলছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে। প্রতিযোগিতার অংশ হিসাবে ইফতারের দাওয়াপত্র নিয়ে দুই নেত্রীর দলীয় দূতরা ছুটছেন বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মহাজোটের বন্ধন আরও শক্ত এবং মিত্র বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। একইভাবে সরকার বিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে বিএনপিও শরণাপন্ন হচ্ছে ছোট দলগুলোর। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পরও উভয় দলই অন্তত এক ডজন ছোট দলের সঙ্গে বৈঠক করে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের শেষ রমজানে জমে উঠছে ইফতার রাজনীতি। শুধু বড় দুটি দলই নয়, দল দুটির নেতৃত্বাধীন জোট শরিক ও এর বাইরে থাকা দলগুলোও এবার বেশ উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন করতে যাচ্ছে। উদ্ভূত রাজনৈতিক নতুন মেরুকরণে তারাও নিজেদের উপস্থিতি ও গুরুত্ব তুলে ধরতে এবার বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে একাধিক ইফতার পার্টির আয়োজন করছে। এসব দলও বড় দুটি দলের কাছে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য নতুন করে জানান দিতে চায়। তাদের কারও লক্ষ্য বর্তমান বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা, কারও লক্ষ্য বড় কারো বন্ধু হওয়া।