অর্থনৈতিক ব্যর্থতাতেই টালমাটাল মিশর
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৩, ১৭:১০
প্রকৃতি মিশরকে দিয়েছে উজাড় করে। কিন্তু এগুলোকে কাজে লাগিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারছে না আর তারই প্রভাব পড়ছে রাজনীতিতে। ধারণা করা হয়েছিলো, আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে একনায়ক হোসনি মুবারক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তার সুফল খুব শিগগিরই ভোগ করতে শুরু করবে দেশটি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সে গুড়েবালি। অনেক আশা নিয়ে মোহাম্মদ মোরসিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলো মিশরের জনগণ। কিন্তু নতুন সরকারের একবছর কেটে গেলেও দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। সেজন্যই তারা ফের ফুঁসে ওঠে। অনেকে আবার এই আফসোসও করছে, হোসনি মুবারকের আমলেই ভালো ছিলাম। তাকে হটানোর কোনো প্রয়োজন ছিলো না।
সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থানের আগে একটি জরিপে মিশরের অর্থনৈতিক বেদনা ও ভবিষ্যতের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো। এতে দেখা গিয়েছিলো, মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী বছর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। অথচ আগের বছর এমন লোকের সংখ্যাটা ছিলো ৫০ শতাংশ। ৪২ শতাংশ রায় দিয়েছিলেন, আগামী বছরে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে। গতবছরের চেয়ে এটি ছিলো ২০ শতাংশ বেশি। শতকরা ৭৬ শতাংশ রায় দিয়েছিলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। মিশরের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেকারত্ব। দেশটিতে বর্তমানে ৩.৫ মিলিয়ন লোক কর্মহীন। মুরসি সরকারের লক্ষ্য ছিলো, চলতি অর্থবছরে বেকারত্বের হার (যা শুরু হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে)। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় গত অর্থবছরের শেষদিকে জানিয়েছিলো, আসছে অর্থবছরে ৮০ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলো, এ সংখ্যাটা বেকারত্বের হার কমাতে মোটেই অবদান রাখবে না। কারণ, মিশরে চাকরির বাজারে প্রতিবছর প্রায় সমসংখ্যক নতুন চাকরি প্রার্থী যুক্ত হয়। অধিকন্তু দেশের ২৭.৩ মিলিয়ন স্ট্রং ওয়ার্কফোর্সেও ২১.৩ মিলিয়নই অস্থায়ী শ্রমিক। এর ৪৬.৫ শতাংশ কাজ করে আন-অফিসিয়াল খাতে এবং কোনো চুক্তি ছাড়াই। ৬৭ শতাংশেরই স্বাস্থ্যবীমা নেই। অবাক করার মতো তথ্য হলো— মিশরের ২৫ শতাংশ লোক এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। রাজধানী কায়রোর ফুটপাতে অনেকেই শুয়ে থাকে সাহায্য পাওয়ার আশায়। খাবার কিনে খাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। অথচ হোসনি মুবারকের আমলে এতোটা খারাপ পরিস্থিতি ছিলো না।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে মুরসির ফ্রীডম এন্ড জাস্টিস পার্টির অর্থনৈতিক কমিটির সদস্য আব্দেল হামিদ স্বীকার করে নিয়েছিলেন তাদের সরকার কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। তবে মিশরের এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা একবারে নতুন কিছু নয়। মুবারকের সময়কার এবং ক্রান্তিকালের সমস্যাগুলোই বস্তুত আরো ঘনীভূত হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি। নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বাজেট ঘাটতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অধিক প্রত্যাশার কারণে মুরসির সরকার অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। ঘরে ঘরে বিরাজ করছিলো চাপা ক্ষোভ। আসলে সকল অর্থনৈতিক সমস্যার মূলে হলো বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়া। ফের ক্ষোভ ছড়িয়ে পারে, এমন আশঙ্কা হয়তো মুরসির মনের মধ্যেও ছিলো। জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি উদ্যোগ সবার নজর কেড়েছিলো। গমের উত্পাদন বাড়িয়ে বিদেশি গমের উপর নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে কৃষকদের আগের সব কৃষিঋণ মওকুফ করে দেয়া হয়েছিলো। তা সত্ত্বেও বিরোধীরা তার পদত্যাগের দাবিতে সেই বিখ্যাত তাহরির স্কোয়ারে সমবেত হয়ে আন্দোলন শুরু করে।
অনেক কমে গেছে মিশরের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পর্যটন ব্যবসাতে আগের মতো আর তেজীভাব নেই। বিশ্বমন্দার প্রভাব ও মিশরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে কমে গেছে পশ্চিমা পর্যটকদের সংখ্যা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজেট দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যাচ্ছিলো, সেই পুরনো সমস্যাগুলো নিয়েই হাবুডুবু খাবে মুরসি সরকার। এতে নতুন প্রকল্পের জন্য তেমন বরাদ্দ নেই। বাড়তো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় এবং বাজেটের ঘাটতি মেটাতে মুরসি সরকারকে ঋণ নিতে হতো দেশি-বিদেশি উত্স থেকে। সেইসঙ্গে গুণতে হতো প্রচুর সুদ। এ সবকিছুর পর ক্রমাবনতিশীল জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের পেছনে ব্যয়ের জন্য খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকতো। চলতি অর্থবছরের জন্য পাস হওয়া বাজেটে মুরসি সরকার নতুন সরকারি বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলো মাত্র ৭৩.৭ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (৯.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিশরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে সম্পন্ন হওয়া জরিপটিতে (পিউ সার্ভে কর্তৃক) একটি প্রশ্ন ছিলো, আপনি কি দৃঢ় অর্থনীতির চেয়ে দৃঢ় গণতন্ত্রকে বেশি পছন্দ করেন। এমন প্রশ্ন শোনার পর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন শতকরা ৪৫ জন। পক্ষান্তরে ৫২ শতাংশের জবাবের সারমর্ম ছিলো, শক্তিশালী গণতন্ত্রের চেয়ে সুদৃঢ় অর্থনীতির অধীনে থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতএব বলা যায়, বসন্তের বাতাস বওয়া প্রয়োজন আসলে অর্থনীতিতে। তবেই আর উত্তপ্ত হয়ে উঠবে না তাহরির স্কোয়ার।
—ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে