বিসিএস :সর্বাগ্রে মেধা
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩২
৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ফল প্রকাশের পর হইতে অনুত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসিয়া উঠিয়াছে। অভিযোগ উঠিয়াছে, কোটার জাঁতাকলে মেধাবীরা নিষ্পেষিত। এই প্রথমবারের মতো বিসিএসে প্রিলিমিনারি হইতেই কোটা চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে। অতীতে কোটার বিবেচনা করা হইত শুধু মৌখিক পরীক্ষায় পাসের পর। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে নানা বৈষম্যের কারণে পিছাইয়া পড়া জনগোষ্ঠী থাকে, যাহাদের সম্মুখে আনিতে কিছু ছাড় দেওয়া রাষ্ট্রের নীতিকৌশলেরই অংশ। মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানদের সম্মানার্থেও তাহাদের উত্তরসূরিদের জন্য যৌক্তিক সংখ্যায় ও যথাযথ নিয়মে কিছু ‘কোটা’ থাকিতেই পারে। অর্থাত্, বৈষম্য কমাইতে কোটা প্রয়োজন রহিয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তাহা এই শর্তে যে, শেষ ফলাফলে মেধাবীদের বৃহত্তর অংশেরই যেন জয়জয়কার হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠিয়াছে যে বৈষম্য দূর করিতে সৃষ্ট ‘কোটা’ ব্যবস্থা স্বয়ং বৈষম্য সৃষ্টি করিয়াছে। পূর্বের বিসিএস নিয়োগ পদ্ধতিতে এই কোটা ব্যবস্থা কার্যকর করা হইত মেধাকে পাশ কাটাইয়া একদম শেষে গিয়া। অর্থাত্, প্রথমে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হইত। পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার সকল ধাপ পার করিয়া তবেই চাকরি পাইত। কিন্তু এইবার প্রিলিমিনারিতেই কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হইয়াছে। সুতরাং কেহ ৬০ নম্বর পাইয়া কোটার খুঁটির জোরে বিসিএস বৈতরণী পার হইবেন, আর কেহ ৮০ নম্বর পাইয়াও বৈতরণীর স্রোতে ভাসিয়া যাইবেন, তাহা মানিয়া না লইবার যৌক্তিক কারণ রহিয়াছে।
এই বৈষম্য লইয়া ইন্টারনেটের সামাজিক মাধ্যমসহ পত্র-পত্রিকায় যে তর্ক বিতর্কের ঝড় উঠিয়াছে, তাহা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চিরাচরিত দুর্ভাগ্যজনক কর্মকাণ্ডের নূতন অংশ বলা যায়। এই দুর্ভাগ্যের প্রেতাত্মাকে পিএসসি-এর উপর অতীতেও আমরা নানারূপে চাপিয়া বসিতে দেখিয়াছি। বিসিএস প্রশ্নপত্র ফাঁস, মৌখিক পরীক্ষায় সরকারদলীয় লোকদের নম্বর বেশি দেওয়ার অভিযোগ অতি পুরনো। সব সরকারের আমলেই এই অভিযোগের খুব বেশি হেরফের হয় নাই। আমাদের পরিতাপ এইখানেই। রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রে যাহারা কর্মকর্তার আসনে আসীন হইবেন, তাহাদের একটি অংশ যদি অনিয়মের মধ্য দিয়া নিয়োগপত্র অর্জন করেন, তবে প্রশাসনে ঢুকিয়া তাহারাই অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করিবেন।
তবে একই সঙ্গে আমরা ব্যথিত হই, যখন দেখি এই প্রশাসনযন্ত্রের কর্মকর্তা হইবার দাবিদার প্রার্থীরা বিসিএস-এর নিয়োগ নিয়মের সংশোধনের দাবিতে আন্দোলন করিতেছেন জনদুর্ভোগ চরমে তুলিয়া দিয়া। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করিয়া আন্দোলন করিলে তাহা সরকারের নিশ্চিদ্র কর্ণে ছিদ্র সৃষ্টি করিয়া সহজেই প্রবেশ করিতে পারে বলিয়াই কি ঢাকাকে প্রায় নিশ্চল করিয়া সকলে আন্দোলন করিতে উত্সাহিত হন? কিন্তু মেধাবীরা কেন সেই দায়িত্বজ্ঞানহীন পন্থায় আন্দোলন করিবে? তাহারা যদি মেধাবী হইয়া থাকেন, তবে তাহার সহিত দায়িত্বজ্ঞানও সঠিক মাত্রায় অর্জন করা উচিত। এই দায়িত্বজ্ঞান ব্যতীত ‘মেধা’ও পরিণত হইয়া উঠে না। সেই দায়িত্বজ্ঞান হইল, আজ যাহা তিনি করিতেছেন, তিনিই ভবিষ্যতে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা হইলে ইহার বিপরীতে অবস্থান করিবেন। ইহাই দ্বিচারিতা। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার নানা শান্তিপূর্ণ দুর্ভোগবিহীন পদ্ধতি রহিয়াছে। যদি তাহা না থাকে তবে মেধাবীরা তাহাদের দায়িত্বজ্ঞান প্রকাশের অংশ হিসাবে নূতন শান্তিপূর্ণ দাবি আদায়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করুক।
আমরা আমাদের প্রশাসন যন্ত্রে মেধাবীদের পদচারণা দেখিতে চাই। তাহা সর্বার্থেই।